তো Realme C3 এর অফিসিয়াল দাম ১০,৯৯০ টাকা নির্ধারিত হলেও যেকারণেই হোক এই ফোনটা এই দামে বাজারে পাওয়া খুবই কঠিন, দেখা যাচ্ছে ১২-১৩ হাজার এমনকি আরো বেশি দামে ফোনটি বিক্রয় হচ্ছে। ১১ হাজার টাকায় Realme C3 একটা অসাধারণ ডিল, এখানে খুব বেশি মতানৈক্য সম্ভবত থাকবে না। তাই ১১ হাজারে পেলে নিয়ে নিতে পারেন। তবে যদি দামটা অফিসিয়াল দামের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন অবশ্যই প্রশ্ন ওঠে।

ধরে নিন আপনি দোকানে গেলেন, Realme 5i এর দাম চাওয়া হলো ১৪৫০০ টাকা, Realme C3 ১২৫০০ টাকা, Redmi 9 ১৫০০০ টাকা। তো, আপনি যদি ২০০০ বাড়াতে পারেন, Redmi 9 একটি ভালো অপশন থাকছে, কিন্তু আমি ধরে নিচ্ছি আপনার বাজেট ১৩০০০ এবং এর থেকে বাড়ানো সম্ভব নয়। এখন আপনি Realme C3 নিবেন কিনা বা তা কতটা যৌক্তিক হবে সেটা নিয়েই আজকের আলোচনা।

প্রথমে দেখে নিই ১৩০০০ টাকায় এর প্রতিপক্ষ কারা হতে পারে। অদ্ভুতভাবে, এই প্রাইস সেগমেন্টটা খুব একটা কম্পিটিটিভ না। রিয়েলমির সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ, শাওমির পক্ষ থেকে বিশেষ কিছু এই দামে অফিসিয়ালি নেই। Tecno-র পক্ষ থেকে দুটি ডিভাইস আছে Spark 5 Pro (১৩০০০ টাকা), Pouvoir 4 (১২০০০ টাকা)। Samsung Galaxy M01 (১২০০০ টাকা) আছে। Walton RX7 (১৩০০০ টাকা) আছে। আচ্ছা, আমাদের সংক্ষিপ্ত তালিকা শেষ!…

প্রথমেই আমি Samsung Galaxy M01-কে তালিকা থেকে বাদ দিতে চাই। কেননা ওপরে Samsung লেখাটা ছাড়া এটা নেওয়ার বিশেষ কারণ আমি খুঁজে পাইনি। এর ডিজাইন প্রায় কারোই পছন্দ হওয়ার মত না, ডিসপ্লে 5.71″ এখনকার হিসেবে বেশ ছোটখাট, চিপসেট মোটেও শক্তিশালী নয় (SD439), ব্যাটারী বা ক্যামেরা কোন সেকশনেই এই দামে ইমপ্রেসিভ নয়, ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর নেই।

এরপর আসি Tecno Spark 5 Pro। এর আকর্ষণ হলো চমৎকার ডিজাইন, আর 6.6″ পাঞ্চহোল ডিসপ্লে। তবে এর ডিসপ্লেটি HD+ রেজ্যুলেশনের, এই দামে কেউ কেউ কিন্তু FHD বা FHD+ দিয়ে থাকে। এরকম দামে পাঞ্চহোল খুব বেশি এখনো দেখা যায় না, তাই এটা অনেকের জন্যই আকর্ষণীয়। এর আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো এখানে রয়েছে 4GB র‌্যাম এবং 64GB ইনবিল্ট স্টোরেজ। ব্যাটারী আছে 5000 mAh। তবে কিনা তার সাথে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে Helio A25 চিপসেট।

৯০০০ টাকা পর্যন্ত Helio A25 দিলে ঠিক আছে, তবে ১৩০০০ টাকায় এটা দেওয়া একদমই যৌক্তিক নয়। 4GB র‌্যাম মাল্টিটাস্কিংয়ে কিছুটা এডভান্টেজ দিলেও চিপসেটের জন্য পারফর্মেন্স ভালো আশা করার সুযোগ থাকে না। রেয়ারে কোয়াড ক্যামেরার রূপ ধরে আছে সিঙ্গেল ক্যামেরা সেটআপ। হ্যাঁ, এর মেইন ক্যামেরাটি 16MP f/1.8, এই ক্যামেরাটা ঠিক আছে, কিন্তু বাকি তিনটি ক্যামেরা সিম্পলি শো, 2MP Macro, 2MP Depth, AI লেন্স, যাদের প্রাক্টিকাল ইউসেজ না থাকার মত। অন্যদিকে সামনের ক্যামেরাটি 8MP। তো, এই ফোনটি নেওয়ার কারণ হতে পারে পাঞ্চহোল, আর 4/64।

এরপর আমরা আসি Tecno Pouvoir 4-এ। চমৎকার ডিজাইনের এই ফোনটি মাল্টিমিডিয়া কনজ্যুমারদের উদ্দেশ্যে তৈরি। 7.0″ এর হিউজ ডিসপ্লে, মানে প্রায় একটা ট্যাব বলা যায়। তবে এই বিশাল ডিসপ্লের রেজ্যুলেশন HD+, ফলে শার্পনেসের ঘাটতি পাওয়াটা স্বাভাবিক। ডুয়াল স্টেরিও স্পিকার প্রভাইড করছে, যেটা এত কম দামে আর কেউ সম্ভবত দিচ্ছে না। আর এটা একটা হিউজ পাওয়ারহাউজ, 6000 mAh ব্যাটারী দেওয়া হয়েছে এখানে।

তবে এই ফোনটির বাকি হার্ডওয়্যার স্পেক বড্ড শোচনীয়। এখানে দেওয়া হয়েছে Helio A22, একটি কোয়াড কোর চিপসেট! এই দামে এত লো পাওয়ার চিপসেট একদমই আন এক্সপেক্টেড। র‌্যাম 3GB এবং রম 32GB। ক্যামেরা এখানেও বাহির থেকে ৪টি দেখা যাবে, তবে আদতে Spark 5 Pro এর মত অবস্থা, বরং মেইন ক্যামেরাতে ডাউনগ্রেড, 13MP। বুঝতেই পারছেন, ওভারঅল ফোনটি এই বাজেটের সাথে একদমই যায় না।

তবে আমাদের শেষ প্রার্থীটি কিন্তু ইন্টেরেস্টিং, Walton Primo RX7। এর ফ্রেম প্লাস্টিক তবে সামনে পেছনে 2.5D গ্লাস, ডিজাইন বেশ প্রিমিয়াম। এর 6.3” ডিসপ্লেটি রেজ্যুলেশন FHD+, 2340*1080, অর্থাৎ, এই দামে আকর্ষণীয় একটি ডিসপ্লে। রম 32GB হলেও র‌্যাম 4GB, তাই মাল্টিটাস্কিংয়ের এডভান্টেজ থাকছে। তবে আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেগেছে এখানে প্রায় সবরকম দরকারী-অদরকারী সেন্সর দিয়ে দেওয়া হয়েছে Gyroscope, Compass সহ, আমাদের তালিকার অন্য কোন ফোনেই জাইরোস্কোপসহ এত সেন্সর নেই, ফলে 360 ছবি-ভিডিও উপভোগ, কম্পাস ব্যবহার এগুলো এই ফোনে করা যাবে।

এর ব্যাটারী অবশ্য একটু কম, 3900 mAh, এখন 5000 mAh কমন হয়ে গেছে। তবে থাকছে Type C পোর্ট। চিপসেটও ভালোর মধ্যে থাকবে না, Helio P23, সর্বোচ্চ 2.0GHz Octa-Core Cortex A53 প্রসেসর, যেটি SD439, Helio A22, A25 থেকে সিপিইউ জিপিইউ-এ বেটার হলেও 2017 সালের 16nm চিপসেট। ক্যামেরা পেছনে 16MP+5MP (ডেপথ), সামনে 13MP। যদি টেকনোর মত হয় তাহলে ৪-৫টি ক্যামেরা দেওয়ার কোন যৌক্তিকতা দেখি না, তাই দুটো ক্যামেরা নিয়ে কোন আপত্তি নেই, আর সামনে 13MP বেশ চমৎকার ব্যাপার।

সব মিলিয়ে ডিসপ্লে, মাল্টিটাস্কিং, সেন্সর সেকশনে এই ফোনটি ভালো করেছে তবে পারফর্মেন্সে কিন্তু এটিও খুব সুবিধাজনক নয়। আবার সফটওয়্যারও ব্যাকডেটেড, Android 9.0 Pie আর ওয়ালটনের কাছে টুকটাক বাগ ফিক্সের বাইরে ভার্সন আপডেট একদমই আশা করা যায় না।

কম্পিটিটরদের কথা তো জানলাম এবার আসি তাহলে আমাদের মূল আলোচনায় আসি, Realme C3 এই দামে কতটা ভালো। এটার কী সেলিং পয়েন্ট হলো চিপসেট, Helio G70 ১২৫০০ টাকাতেও কিন্তু বেশ ভালো, বিশেষ করে চিপসেটের দিক দিয়ে যেহেতু কেউই এই দামে ভালো কিছু দিচ্ছে না। তবে অন্য সেকশনগুলোতে ১১ হাজার দামে ঠিক থাকলে ১২.৫-১৩ হাজারে পৌছে গেছে অভিযোগের জায়গা থাকে।

এর ডিজাইন বেশ সুন্দর, তবে কম্পিটিটরদের তুলনায় আমার অতটা ইমপ্রেসিভ লাগেনি। 6.5″ ডিসপ্লেটি HD+ রেজ্যুলেশনের, ভালো বিষয় হলো এখানে Gorilla Glass 3 প্রটেকশন আছে। ব্যাকপার্ট আর ফ্রেম প্লাস্টিকের। সামনের ক্যামেরাটি 5MP f/2.4 😕 কিছু করার নেই। পেছনে তিনটি ক্যামেরা 12MP f/1.8+2MP (ম্যাক্রো)+2MP (ডেপথ)। তো, ক্যামেরা সেকশনও মোটামুটি… এই দামে ইমপ্রেসিভ কিছু একদমই না।

র‌্যাম 3GB, রম 32GB, যেটা ১১ হাজারে চলনসই হলেও এর বেশি দামে কিন্তু মানায় না। মাল্টিটাস্কিং করার ক্ষেত্রে এটা ল্যাগের কারণ হতে পারে। 5000mAh ব্যাটারী আছে, ভালো ব্যাপার, 10W চার্জিং, মাইক্রোইউএসবি টাইপ বি। সেন্সর সেকশনে ম্যাগনেটিক ইনডাকশন সেন্সর আছে, তবে জাইরো সেন্সর নেই।

সব মিলিয়ে চিপসেট-ই এই ফোনের সেলিং পয়েন্ট, বাদবাকি ১২৫০০ টাকায় বিশেষ কিছু না। তবে চিপসেট অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, বলা চলে ফোনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্ট। হেভি টাস্কগুলো ভালোভাবে সম্পন্ন করতে সহায়ক হতে পারে এর চিপসেট আবার লং টার্ম ইউসেজের জন্যও ভালো চিপসেট সহায়ক হয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো কম্পিটিটররা কেউই এখানে তেমন ভালো করতে পারেনি।

অন্যদিকে মাল্টিমিডিয়া প্রথম প্রায়োরিটি হলে Tecno Pouvoir 4 আছে, সেটি হয়ত আপনার প্রয়োজনগুলো ভালোভাবে মেটাতে পারে, যদিও ভ্যালু ফর মানি ট্যাগটি একদমই দিতে পারছি না। আর Walton Primo RX7-এরও কিন্তু চমৎকার কিছু সেলিং পয়েন্ট আছে, যদিও না নেওয়ারও কারণ যথেষ্ট আছে।

সব মিলিয়ে, আপনি যদি একটি পারফর্মেন্স সেন্ট্রিক ফোন চান, তাহলে আসল দামের চেয়ে আরো বেশি খরচ করে C3 নেওয়ার চিন্তা করতে পারেন। এই দামে খুব ভালো অপশনও আসলে নেই। অবশ্যই বাড়তি দামে ফোন বিক্রি কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়, না কেনাটাই তার একটা উত্তম প্রতিবাদ। আমার আরেকটা সাজেশন হবে বাজেট হয় আরেকটু বাড়ান, নয়ত অনেকটা কমান।

আরেকটু বাড়ালে ১৫ হাজারে Redmi 9 আছে, যেটা ডিসপ্লে, চিপসেট, র‌্যাম-রম, ক্যামেরাসহ ওভারঅল বেটার, তবে দুঃখজনকভাবে জাইরো সেন্সর এখানেও নেই। অন্যদিকে (বাড়তি দাম ধরে) ১৪৫০০ টাকায় Realme 5i-ও একটি ভালো ডিল, SD চিপসেটের গ্রহণযোগ্যতা এখনো মিডিয়াটেক থেকে বেশি, জাইরো সেন্সরও আছে, তবে HD+ ডিসপ্লে… আরেকটা কথা বলতে চাই এই দামে OPPO, Vivo যে ফোনগুলো আছে, ওগুলো আমার পক্ষ থেকে একদমই সাজেস্টেড থাকবে না।

অনেকটা কমানোর কথা বললাম, কেননা ১০০০০ টাকার নিচে দামের তুলনায় এখন কিছু ভালো অপশন আছে। তবে পাফর্মেন্স সেন্ট্রিক বায়ারদের জন্য এগুলো সাজেস্টেড না, চিপসেট সুবিধাজনক নয়। বাকিরা দেখতে পারেন, Tecno Spark 5 Pro বা Tecno Pouvoir 4 কেনার চেয়ে বাজেট কমানোটাই বেটার বলব। যেমন ১০০০০ টাকায় Infinix Hot 9 Play, Tecno Spark 5 Pro এর অলমোস্ট সেম স্পেক অফার করছে, 4/64, Helio A25, শুধু ক্যামেরাতে পিছিয়ে (সংখ্যা ব্যাপার না, কোয়ালিটিতেও)।

আবার দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোও এই দামে ভালো অবস্থানে। Symphony Z30 (৯৮০০ টাকা, 3/32), Z28 (৯০০০ টাকা, 3/32), Z16 (৮৩০০ টাকা, 2/32) এগুলোও সুন্দর ডিজাইন, 6.5″ ডিসপ্লে, Helio A25 চিপসেট, আল্ট্রাওয়াইড লেন্সসহ দাম অনুযায়ী ভালো ত্রিপল ক্যামেরা সেটআপ নিয়ে মার্কেটে বেশ চলছে। অন্যদিকে ওয়ালটনেরও Primo HM5 (৮৬০০ টাকা, 3/64), H9 Pro (4/64) আছে, কম দামে বেশি র‌্যাম-রম দিয়ে সাড়া ফেলেছে, যদিও চিপসেট কোয়াড কোর Helio A20 আর ডিসপ্লে 6.1″।

সব মিলিয়ে, আপনার ডিসিশন অবশ্যই আপনার হাতে। আমি জাস্ট চেষ্টা করলাম একটু হেল্প করতে অথবা কনফিউশন আরো বাড়িয়ে দিতে। এখন তাহলে দেখে শুনে বুঝে ঠিক করে ফেলুন আপনার ডিশিসন!

ছবি সোর্স ও Realme C3 বিস্তারিত: অফিসিয়াল ওয়েবপেজ

Leave a Reply