সালাত: ঈমান ও কুফরের পার্থক্যকারী

আল কুরআনুল কারীমের দ্বিতীয় সূরা, সূরা আল বাকারার শুরুতে মুত্তাকীদের পরিচয় সম্পর্কে বলা হচ্ছে। মুত্তাকী মানে হলো তাকওয়াবান- যারা আল্লাহকে ভয় করে। সূরাটির দ্বিতীয় আয়াতে বলা হচ্ছে- “এটা ঐ কিতাব যাতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য পথ নির্দেশ।” এখন মুত্তাকীদের পরিচয় কী? তৃতীয় ও চতুর্থ আয়াতে এ সম্পর্কে এসেছে- “যারা গায়বের প্রতি ঈমান আনে, নামায কায়িম করে এবং আমি যে জীবনোপকরণ তাদেরকে দিয়েছি তাথেকে তারা ব্যয় করে। আর তোমার প্রতি যা নাযিল হয়েছে ও তোমার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তাতে তারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং পরকালের প্রতিও তারা নিশ্চিত বিশ্বাসী।”

মুত্তাকীদের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ঈমান আনার পরেই এসেছে নামাজ কায়েম করার কথা। যেখান থেকে নামাজের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। এখন প্রশ্ন হলো মুত্তাকী হওয়ার প্রয়োজন কী? পরের আয়াত, অর্থাৎ সূরা আল বাকারার পঞ্চম আয়াতে বলা হচ্ছে- “তারাই তাদের প্রতিপালকের হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত আছে, আর তারাই সফলকাম।”

আমরা কেউ কি আছি, যে সফল হতে চাই না? আমরা দিনরাত চেষ্টা করছি দুনিয়ার জীবনে নিজেকে সফল করতে- একটা ভালো ক্যারিয়ার গড়তে, সমাজের চোখে সফল একজন হিসেবে পরিচিত হতে। অথচ যদি এই সফলতাকেই আমরা প্রকৃত সফলতা মনে করি, পার্থিব সফলতাকেই আমাদের মাকসাদ বানিয়ে নিই, তবে তা নিজের প্রতি প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। বরং প্রকৃত সফলতা তো হবে যদি জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে আমাদের জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়।

“প্রতিটি জীবন মৃত্যুর আস্বাদ গ্রহণ করবে এবং ক্বিয়ামাতের দিন তোমাদেরকে পূর্ণমাত্রায় বিনিময় দেয়া হবে। যে ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা করা হল এবং জান্নাতে দাখিল করা হল, অবশ্যই সে ব্যক্তি সফলকাম হল, কেননা পার্থিব জীবন ছলনার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়।”- সূরা আল ইমরান, আয়াত ১৮৫

সালাত ত্যাগ করার পরিণতি এতটা ভয়াবহ যে হাদিসে এভাবে এসেছে-

জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ কুফর ও ঈমানের মধ্যে পার্থক্য হল নামায ত্যাগ করা। – জামে’ আত-তিরমিজি, হাদিস নং ২৬১৮

একজন মু’মিন আর একজন কাফিরের পার্থক্য হলো দিনে পাঁচবার, যখন সালাতের ওয়াক্ত হবে, মু’মিন ব্যক্তি সালাত আদায় করবে- কাফির ব্যক্তি করবে না। আমাদের সমাজে কেউ কেউ একটা কথা বলে, নামাজ পড়িনা, কিন্তু ঈমান ঠিক আছে। কথাটা নিছক হাস্যকর ছাড়া কিছু না, কেননা কারো ঈমান ঠিক থাকলে তার প্রথম প্রতিফলন দেখা যাবে নামাজ আদায়ের মধ্যে। নামাজ ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেয়া ঈমানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সালাতের ক্ষেত্রে কোন অযুহাত নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি সুস্থ মস্তিষ্কে আছেন এবং শরঈ দৃষ্টিকোণে আপনি প্রাপ্তবয়স্ক এবং আপনি একজন মুসলিম- ফরজ নামাজ ওয়াক্তের মধ্যে অবশ্যই আদায় করতে হবে। হযরত উমর রা.-এর প্রসিদ্ধ বাণী- নিশ্চয়ই আমার কাছে তোমাদের সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সালাত। যে ব্যক্তি সালাতের হেফাযত করল, যত্ন সহকারে তা আদায় করল, সে তার দ্বীনকে হেফাযত করল। আর যে তাতে অবহেলা করল, (দ্বীনের) অন্যান্য বিষয়ে সে আরো বেশি অবহেলা করবে। –মুয়াত্তা মালেক, বর্ণনা ৬; মুসান্নাফে আবদুর রযযাক, বর্ণনা ২০৩৮

হ্যা, যদি সত্যিকার অর্থে এমন কিছু হয়, যেখানে আপনার কিছু করার থাকে না- সে ব্যাপারে আল্লাহর ক্ষমার আশা করা করা যায়। যেমন ফজর পড়ার জন্য আপনি হয়ত আগে আগে ঘুমালেন, এলার্ম দিয়ে রাখলেন বা কাউকে জাগিয়ে দিতে বলে রাখলেন- কিন্তু এরপরও সেসময়ে জাগা পেলেন না- এরকম ক্ষেত্রে ঘুম থেকে ওঠার পর কাযা আদায় করে নিতে হবে।

সহীহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ কেউ কোন সলাত করতে ভুলে গেলে যখন স্মরণ হবে তখনই যেন তা আদায় করে নেয়। এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া আর কোন কাফফারাহ্ তাকে দিতে হবে না। [হাদিস নং: ১৪৫২ (আন্তর্জাতিক – ৬৮৪ )]

কিন্তু যদি এমন হয় আপনি সারারাত জেগে ফজরের একটু আগে ঘুমিয়ে গেলেন বা ফজরে ওঠার চেষ্টাও করলেন না, তা হলে কি ক্ষমার আশা করা যায়?

নামাজের ক্ষেত্রে কোন অযুহাত নয়- দুনিয়াবী কোন কাজ বা ব্যস্ততার কারণে নামাজ ছেড়ে দেয়ার কোন সুযোগ নেই। ওয়াক্তের মধ্যে নামাজ অবশ্যই আদায় করতে হবে, সেই সাথে ছেলেদের জন্য বিশেষ কোন পরিস্থিতি না হলে জামাআতে শরীক হওয়া সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ বা ওয়াজিব। সময়ের মধ্যে নামাজ পড়ার জন্য যদি পোশাকে সমস্যা থাকে তবে তা পরিবর্তন করতে হবে, যদি অপবিত্রতা থাকে তবে প্রয়োজন অনুযায়ী পবিত্রতা অর্জন করে নিতে হবে- এইসব অযুহাতে কখনোই নামাজ ছাড়া যাবে না।

আরেকটি চিন্তা কারো কারো মধ্যে থাকে- যে আমি তো এই পাপ, সেই পাপ কতকিছু করি- আমার মত পাপী কী করে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে পারে? আমি তো একটু আগেই কতরকম গুনাহ করলাম, এখন আবার কীভাবে সবার সাথে সালাতে দাঁড়াই? কখনোই এভাবে ভাবা যাবে না। আমরা কেউই পারফেক্ট না। আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যার দ্বারা কখনো কোন গোনাহের কাজ হয়নি। সব গোনাহ-ই ভয়ঙ্কর, কিন্তু সালাত ত্যাগ করার ভয়াবহতা অনেক বেশি। অন্যদিকে আমরা যা-ই করি না কেন, সালাত কোন অবস্থাতেই ছেড়ে দেয়া যাবে না। আমরা যতই পাপ করি না কেন, ফরজ সালাত ত্যাগ করার অপরাধ যেন কোনভাবেই না হয়, এখানে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। যত বড় পাপী-ই আমরা হই, সালাতের সময় আল্লাহর সামনে যদি একনিষ্ঠভাবে দাঁড়াতে পারি- ইন শা আল্লাহ সালাতের মধ্য দিয়ে অন্য গোনাহগুলো থেকেও আমরা বের হয়ে আসতে পারবো।

“তুমি পাঠ কর কিতাব হতে যা তোমার প্রতি ওয়াহী করা হয়েছে এবং সালাত কায়েম কর। সালাত অবশ্যই বিরত রাখে অশ্লীল ও মন্দ কাজ হতে আর আল্লাহ তা‘আলার স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমরা যা কর আল্লাহ তা‘আলা তা জানেন।”- সূরা আল আনকাবুত – আয়াত ৪৯

আশা করা যায়, অন্যদিকে গোনাহগার হওয়া সত্ত্বেও নিয়মিত সালাত আদায় করতে থাকলে অন্য গোনাহগুলো থেকেও বের হয়ে আসা সম্ভব হবে। এখন কেউ কেউ বলতে পারেন, আমি তো নামাজও পড়ি আবার গুনাহও করি। সালাত কীভাবে আমাকে অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখলো? যদি কেউ যথাযথভাবে সালাত আদায় করে, তবে সালাত তার অন্তরকে আলোকিত ও পবিত্র করে। সে ব্যক্তির ঈমান ও তাকওয়া বৃদ্ধি পায়। ফলে সৎকর্মের প্রতি আগ্রহ এবং অশ্লীল ও মন্দ কর্মের প্রতি অনাগ্রহ তৈরি হয়। তাই নিয়মিত সালাতের শর্তসমূহ রক্ষা করে একনিষ্ঠভাবে সালাত আদায় করতে থাকলে তা অশ্লীল ও মন্দ কাজ হতে বিরত রাখতে পারে।

মূল কথা হলো, একজন মু’মিন ও তাক্বওয়াবান ব্যক্তি সব ধরণের গোনাহ থেকেই বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে- কিন্তু অন্য গোনাহ করুক বা না করুক সালাত কোন অবস্থাতেই ছাড়বে না- বরং সালাতের মাধ্যমে অশ্লীল ও অপকর্ম থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে।

নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ ক্বিয়ামাতের দিন মানুষের ‘আমালসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম তাদের সালাত সম্পর্কে হিসাব নেয়া হবে। তিনি বলেনঃ আমাদের মহান রব্ব ফেরেশতাদের বান্দার সালাত সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও জিজ্ঞেস করবেন, দেখো তো সে তা পরিপূর্ণভাবে আদায় করেছে নাকি তাতে কোন ত্রুটি রয়েছে? অতঃপর বান্দার সালাত পূর্নাঙ্গ হলে পূর্নাঙ্গই লিখা হবে। আর যদি তাতে ত্রুটি থাকে তাহলে মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের বলবেন, দেখো তো আমার বান্দার কোন নফল সালাত আছে কিনা? যদি থাকে তাহলে তিনি বলবেনঃ আমার বান্দার ফরয সালাতের ঘাটতি তার নফল সালাত দ্বারা পরিপূর্ণ করো। অতঃপর সকল আমলই এভাবে গ্রহন করা হবে (অর্থাৎ নফল দ্বারা ফরযের ত্রুটি দূর করা হবে)। – সুনানে আবু দাউদ, ৮৬৪

অর্থাৎ, কিয়ামতের কঠিন দিনে আমাদের প্রথমে সালাতের হিসাব দিতে হবে। আমরা কেউই চাইবো না সে কঠিন দিনে আমাদের জন্য শুরুতেই হিসাব কঠিন হয়ে যাক। তাই আর সবকিছুর চেয়ে সালাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে সবসময়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের ৫ ওয়াক্ত সালাত সঠিকভাবে আদায়ের তাওফিক দিন, পাশাপাশি অধিক পরিমাণ নফল সালাত ও অন্যান্য ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.