আসসালামু আলাইকুম।
আমরা অনুভব করতে পারি, আমরা নিজেদের অস্তিত্বের বিষয়ে সচেতন- সম্ভবত এরকমটাই সবচেয়ে সহজাতভাবে আমাদের কাছে জীবনের ধারণা। যদিও এই ধারণা সব জীবের জন্য কতটা সত্য বাহ্যিকভাবে বোঝা প্রায় অসম্ভব। শতবর্ষী গাছটা যেটা ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে- ওটাও তো জীবন। সে জীবন কেমন, আমাদের সবচেয়ে আশ্চর্যতম কল্পনাতেও বোধহয় আনা সম্ভব না।
সত্যি কথা হলো, জীবন কীরকম, এই বিষয়ে আমরা খুব সামান্যই জানি।
তারা তোমাকে রূহ (আত্মা) সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল, “রূহ হল আমার প্রভুর আদেশের ব্যাপার। (এ সম্পর্কে) তোমাদেরকে সামান্যই জ্ঞান দেওয়া হয়েছে।”
কুরআন – সূরা আল ইসরা, আয়াত ৮৫
আমরা রূহ বা আত্মাকে কোন ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য ধারণাতে আনতে পারি না। আমরা শুধু তার বাহ্যিক প্রকাশগুলো দেখতে পাই। তারপরও জীব আর জড় এই ভাগদুটো যে আছে, এই ধারণাটুকু ছোটবেলা থেকে আমাদের কাছে অনিবার্য হয়ে থেকেছে। নিশ্চল সামুদ্রিক প্রবালপ্রাচীরটা জীবন্ত, কিন্তু উত্তাল স্রোতস্বিনী নদীটা জড়- এই পার্থক্যটা আমাদের তাই নতুন করে হতবাক করে তোলে না।
ভাইরাসকে আমরা অনেকে অতিক্ষুদ্র জীব হিসেবেই জানি। তবে ভাইরাসের ব্যাপারটা আর সব জীব থেকে বেশ আলাদা। কারো কারো কাছে ভাইরাস জীব আর জড় পদার্থের মাঝামাঝি কিছু। উচ্চ মাধ্যমিকে জীববিজ্ঞান বিষয়টা যাদের ছিলো, তারা পড়েছিলাম, ফরাসি অণুজীববিদ আন্দ্রে লুওফ (André Lwoff) ভাইরাসকে জীব আর জড় কোন শ্রেণিতেই রাখতে চাননি। তিনি ভাইরাসকে তার নিজের জায়গাতেই রাখতে চেয়েছেন। ভাইরাস ভাইরাসই, it is what it is।
জীবন
কোনটা জীব আর কোনটা জড়- সহজাতভাবে আমরা এই ধারণা করতে পারলেও কিছু কিছু জায়গায় এসে আমাদের জন্য জীবনের একটা প্রাতিষ্ঠানিক সংজ্ঞা দেয়া ছাড়া সামনে আগানো কঠিন হয়ে যায়। ভাইরাসকে জীব বলা যায় কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদের প্রথমেই সংজ্ঞা দিতে হবে জীবন বলতে আমরা কী বুঝছি।
প্রথমত, আমরা যদি বলি অনুভবের ক্ষমতা বা নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সচেতন হওয়া- এটা ব্যবহারিকভাবে আমাদের সাহায্য করবে না। মানুষের অনুভবের ক্ষমতার জন্য আমরা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রকে দায়ী করতে পারি। কিন্তু ব্যাকটেরিয়া, উদ্ভিদ, স্পঞ্জ প্রভৃতিদের মানুষের মত স্নায়ুতন্ত্র নেই। তারা কি অন্য কোনভাবে অনুভব করতে পারে? বিজ্ঞান যেহেতু মানুষের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার সীমানায় সীমাবদ্ধ, কাজেই এই প্রশ্নটা অনেকাংশে বিজ্ঞানার সীমারেখা পেরিয়ে অনেক বেশি দার্শনিক প্রশ্নে পরিণত হয়।
জীববিজ্ঞানে আমাদের এমন কোন সংজ্ঞা প্রয়োজন যেটা আমরা বাহ্যিকভাবে শনাক্ত করতে পারবো। যদি বলি চলাফেরা বা নড়াচড়া করতে পারা, সব জীবের জন্য এই বৈশিষ্ট্য সমান না। জড়বস্তুতেও বিভিন্ন ধরণের মুভমেন্ট থাকে। যদি বলি সংখ্যা বা বংশবৃদ্ধি করতে পারা- নদী থেকে শাখানদীর জন্ম হয়, ক্রিস্টালের খন্ড থেকে উপযুক্ত পরিবেশে তা বৃদ্ধি পায়। কাজেই এটাও এককভাবে জীবের সংজ্ঞা হিসেবে যথেষ্ট না।
কাজেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমরা জীবনকে সাধারণত শুধু একটা বৈশিষ্ট্য দিয়ে চিহ্নিত করি না, একাধিক বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি দিয়ে চিহ্নিত করি, যেমন- বিপাকীয় শক্তি উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ স্থিতি রক্ষা (হোমিওস্ট্যাসিস), বিকাশ, পুনরুৎপাদন (রিপ্রোডাকশন), উদ্দীপনার প্রতি সাড়া দেয়া, পরিবর্তিত পরিবেশে মানিয়ে নেয়া। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই জীবনের মৌলিকতম প্রকাশ।
কোষ ও নিউক্লিক এসিড
জীবের যে বৈশিষ্ট্যগুলো বলা হলো- কোষ হলো সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম অংশ যা এই বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ করে। কোষে বিপাকীয় কার্যকলাপ হয়, কোষের বিকাশ ঘটে, কোষ বিভাজনের মাধ্যমে পুনরুৎপাদন ঘটে ইত্যাদি। এজন্য কোষকে জীবদেহের গঠন ও কাজের একক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
আমরা দেখি বাবা-মায়ের সাথে মিলসম্পন্ন বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সন্তানসন্ততিতে দেখা যায়। বংশগতীয় এই বৈশিষ্ট্যগুলো কোষের মধ্যে থাকা নিউক্লিক এসিড বহন করে। নিউক্লিক এসিড দু’রকম- DNA ও RNA। জীবের ক্ষেত্রে DNA মূলত বংশগতির বস্তু হিসেবে কাজ করে। DNA-তে দুটো প্যাচানো সুতার মত গঠন থাকে। চার ধরণের নিউক্লিওটাইড ক্ষার- অ্যাডিনিন (A), থায়মিন (T), গুয়ানিন (G), সাইটোসিন (C) থাকে প্রতিটি সুতাতে।
DNA-তে নিউক্লিওটাইডগুলোর বিন্যাস অনেকটা কোডের মত কাজ করে, এটাকে বলা হয় জেনেটিক কোড। কীরকম বিন্যাস আছে তার ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট অ্যামিনো এসিড এসে যুক্ত হতে পারে। এভাবে নিউক্লিওটাইডের বিন্যাস অনুযায়ী একটার পর একটা অ্যামিনো এসিড এসে বসে। ধরা যাক TAC থাকলে একটা অ্যামিনো বসবে, AGT থাকলে আরেকটা। এরকমভাবে নিউক্লিক এসিডের গঠন অনুযায়ী অ্যামিনো এসিডের ভিন্ন ভিন্ন চেইন তৈরি হয়, আর এই চেইনটাই হলো প্রোটিন। বিভিন্ন ধরণের অ্যামিনো এসিড আছে, কোনটার পর কোনটা বসছে সে অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন প্রোটিন তৈরি হবে। এই প্রক্রিয়াটা কোষের রাইবোজমের মধ্যে ঘটে।
এই প্রোটিনগুলো বিভিন্ন হরমোন, এনজাইম, গাঠনিক বিভিন্ন বস্তু হিসেবে কাজ করে। ফলে উৎপন্ন প্রোটিনের ভিত্তিতে আমাদের উচ্চতা, চোখের রং, চুলের ধরণ, এমনকি ব্যক্তিত্ব প্রভৃতি বহু অংশে নিয়ন্ত্রিত হয়।
তবে কোষে শুধু নিউক্লিক এসিডই থাকে না। সাইটোপ্লাজম, রাইবোজম, মাইটোকন্ড্রিয়া, গলজি বস্তু এরকম বিভিন্ন অঙ্গাণু থাকে যারা প্রত্যেকে আলাদাভাবে নির্দিষ্ট কিছু ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই উপাদানগুলোর কোনটি এককভাবে জীবনের সব বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে না। যখন সম্পূর্ণ কোষ বিবেচনা করা হয়, তখনই আমরা জীবনের সব কার্যকলাপ সেখানে দেখতে পাই।
কোষের মধ্যে আবার দুটো প্রকার আছে- আদিকোষ ও প্রকৃত কোষ। আদিকোষ খুব সরল গঠনের। কোষের সাইটোপ্লাজমে নিউক্লিক এসিড ছড়ানো থাকে, আর রাইবোজম থাকে। ব্যাকটেরিয়ার কোষ এই প্রকৃতির। উদ্ভিদ ও প্রাণীদের কোষে আবার নিউক্লিয়াস একটা অংশ থাকে, নিউক্লিক এসিড নিউক্লিয়াসের মধ্যে থাকে। আবার মাইটোকন্ড্রিয়া, এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা, গলজি বস্তু এরকম বিভিন্ন অঙ্গাণু থাকে। এরকম কোষগুলোকে প্রকৃত কোষ বলা হয়। আণুবীক্ষণিক কিছু জীব মাত্র একটা কোষ দিয়ে তৈরি, আবার বিভিন্ন উদ্ভিদ বা প্রাণী অসংখ্য কোষ দিয়ে তৈরি।
তবে এই পার্থক্যগুলোর মাঝে আমরা একটু আগে জীবনের যে বৈশিষ্ট্য বা শর্তগুলো বললাম, সব ধরণের জীবকোষ সেই শর্তগুলো পূরণ করে। সকল জীব কোষ দিয়ে তৈরি হয়।
তবে ভাইরাস আদিকোষ বা প্রকৃতকোষ কোনটাই না। ভাইরাসকে ‘অকোষীয়’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, অর্থাৎ কোষ দিয়ে তৈরি না।
ভাইরাস কী?
ভাইরাস আসলে শুধুই প্রোটিন আবরণে আবৃত নিউক্লিক এসিড (DNA অথবা RNA)।
নিউক্লিক এসিড আমরা যেমন বলছিলাম, যে প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। ভাইরাসের নিউক্লিক এসিড-ই আসলে তার প্রোটিন আবরণ তৈরির নির্দেশনা। একেক ভাইরাসের নিউক্লিক এসিড একেকরকম, সে কারণে প্রোটিন আবরণটাও বিভিন্নরকমের। এর বাইরে কিছু কিছু ভাইরাসে অবশ্য বাইরে লিপিডের আরেকটা স্তর তৈরি হয়।

এখন ভাইরাসের মধ্যে সেই নির্দেশনাগুলো আছে, যেগুলো তার প্রতিলিপি তৈরি করাকে সম্ভব করে তোলে। কিন্তু সে নির্দেশনা বাস্তবায়নের মত উপাদান ভাইরাসে নেই। ভাইরাস যদি কোনভাবে এই নিউক্লিক এসিডের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারতো, এবং সেখান থেকে প্রোটিন তৈরি করতে পারতো, তাহলে ভাইরাসের সংখ্যাবৃদ্ধি বা replication হত। কিন্তু ভাইরাসের মধ্যে তার জন্য প্রয়োজনীয় কোষের উপাদানগুলো- যেমন নিউক্লিক এসিডের প্রতিলিপি তৈরির জন্য সাইটোপ্লাজম বা নিউক্লিয়াস, প্রোটিন তৈরির জন্য রাইবোজম- কোনটাই নেই।
আমরা কি অনুমান করতে পারছি ভাইরাস তাহলে কীভাবে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারে? হ্যা, ভাইরাসের নিউক্লিক এসিড যদি অন্য কোন জীবকোষে প্রবেশ করতে পারে, তাহলে সেই কোষের সাইটোপ্লাজম বা নিউক্লিয়াসের মধ্যে তার প্রতিলিপন সম্ভব এবং রাইবোজমের মাধ্যমে সেখান থেকে আমিষ আবরণ তৈরি সম্ভব।
তো যেটা হয় ভাইরাস যখন অন্য জীবকোষের সংস্পর্শে আসে, তখন ভাইরাসের মধ্যে থাকা DNA বা RNA সেই কোষের মধ্যে রাসায়নিক বা যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করতে পারে। তখন সেই কোষের মধ্যে সেই DNA বা RNA-র প্রতিলিপি তৈরি হয়, এবং সেইখান থেকে রাইবোজমে প্রোটিন তৈরি হয়। আমরা যেমনটা বলছিলাম, সেই প্রোটিনটাই মূলত ভাইরাসের প্রোটিন আবরণ। তো এই প্রোটিন আবরণ এবং প্রতিলিপি হওয়া DNA বা RNA গুলো একত্রিত হলে আবার নতুন ভাইরাস সৃষ্টি হয়। এটা ভাইরাসের সংখ্যাবৃদ্ধির প্রক্রিয়া।
আবার এই প্রক্রিয়ার মধ্যে হুবহু একই ভাইরাস তৈরি না হয়ে বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে প্রতিলিপি হওয়ার সময় নিউক্লিক এসিডের বিন্যাসে কোন ভিন্নতা সৃষ্টি হতে পারে। এর মাধ্যমে ভাইরাসের নতুন প্রকরণ সৃষ্টি হয়। অনেক প্রকরণ হয়ত যথাযথ প্রোটিন আবরণ তৈরির মত হয় না, ফলে সেগুলোর বিস্তার ঘটতে পারে না এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়- অর্থাৎ প্রোটিন আবরণ তৈরি না হলে সেগুলোকে ভাইরাস বলা যায় না। যে প্রকরণগুলো শক্তিশালী হয়, সেগুলো টিকে থাকে এবং পুনরায় সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারে।
এভাবে জীবকোষের সংস্পর্শে আসলে ভাইরাস সংখ্যাবৃদ্ধি, পরিবেশের প্রতি সাড়া প্রদান, অভিযোজন এরকম বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ করতে পারে। তবে সাধারণত আমরা এই পুরো প্রক্রিয়াটাকে রাসায়নিক কিছু কার্যকলাপ হিসেবেই দেখি, প্রাণের প্রকাশ হিসেবে দেখি না। জীবকোষের বাইরে ভাইরাস আর সব জড় পদার্থের মতই।
তাহলে মূলত ভাইরাস হলো আবরণ তৈরি করতে পারে এমন একটা প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা (নিউক্লিক এসিড) এবং সেই নির্দেশনা থেকে তৈরি প্রোটিন আবরণ।
ভাইরাস কীভাবে রোগ সৃষ্টি করে?
ভাইরাসের প্রকাশ-ই আসলে জীবকোষকে সংক্রমণ করার মধ্য দিয়ে। আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি, একটা ভাইরাস যখন জীবকোষের উপাদানগুলো নিজের পুনরুৎপাদনে, নিজের কোড অনুযায়ী প্রোটিন তৈরিতে ব্যবহার করছে- তখন সেটা সে কোষের জন্য খুব ভালো বিষয় না। এর মধ্য দিয়ে আবার ভাইরাস সংখ্যাবৃদ্ধি করছে। তাই পারিপার্শ্বিক কোষগুলোতেও এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
ভাইরাসকে অতি-আণুবীক্ষণিক বলা হয়। মানে কিনা সাধারণ আলোক অণুবীক্ষণ যন্ত্রেও এদের দেখা যেতো না। পরবর্তীতে অনেকগুণ বেশি শক্তিশালী ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার হলে ভাইরাস দেখা সম্ভব হয়।
তার আগে ভাইরাসের অস্তিত্ব আমরা প্রথম জানতে পেরেছি এর রোগ সৃষ্টির ক্ষমতার মধ্য দিয়ে। ১৮৯২ সালে তামাক পাতায় মোজাইকের মত ক্ষত সৃষ্টি হয়, এরকম একটা রোগ নিয়ে কাজ করার সময় ডাচ বিজ্ঞানী দিমিত্রি আইভানোভস্কি খেয়াল করলেন ব্যাকটেরিয়া পরিশোধন করা যায় এমন সূক্ষ্ম ছাঁকনিতেও এই রোগের জীবাণু আটকাচ্ছে না। অর্থাৎ এটা ছিলো আরো ক্ষুদ্র কিছু, একটা ভাইরাস। বর্তমানে আমরা বলি Tobacco Mosaic Virus। ভাইরাসের প্রথম দিকের গবেষণাগুলো অনেক বেশি হয়েছে এই ভাইরাসের ওপর।
ভাইরাসের প্রকৃতি যে আর সব জীবের থেকে বেশ অদ্ভুত, তা বিভিন্ন সময়ের গবেষণায় দেখা যাচ্ছিলো। মার্টিনাস বেইজারিঙ্ক এটাকে নাম দিয়েছিলেন contagium vivum fluidum (সংক্রামক জীবন্ত তরল)- অর্থাৎ তিনি এটাকে তরল প্রকৃতির কোন জীব মনে করছিলেন। পরে অবশ্য ভাইরাস যে তরল না, বরং কণাজাতীয়, এটা প্রমাণ হয়েছিলো। ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের পর আমরা ভাইরাসের গঠন-প্রকৃতি নিয়ে আরো সূক্ষ্মভাবে জানতে পেরেছি।

তো যেটা বলছিলাম, আমাদের দিক থেকে ভাইরাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটা জীবকোষে সংক্রমণকারী কণা। তবে আমরা সেই ব্যাপারটাকেই রোগের টিকা আবিষ্কার, নিরাময়, উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসল আবিষ্কার প্রভৃতিতে ব্যবহার করতে শিখেছি- UNO reverse! যেমন- কোষের মধ্যে টিকা হিসেবে নির্দিষ্ট ভাইরাস প্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরির জেনেটিক উপাদান পৌঁছে দিতে ভাইরাস ব্যবহার, ব্যাকটেরিয়াসৃষ্ট রোগ নিরাময়ে ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমণকারী ভাইরাসের ব্যবহার, বা ফসলের DNA-তে কাঙ্ক্ষিত কোন পরিবর্তন আনতে ভাইরাস ব্যবহার করা।
ভাইরাস কি জীবিত?
একজন মানুষের শ্বাস যখন একবার বন্ধ হয়ে যায়, শত চেষ্টা করেও আমাদের কারো সাধ্য নেই তার প্রাণ ফিরিয়ে আনার। জীবনের আরেকটা অনিবার্য বৈশিষ্ট্য হলো এর পরিসমাপ্তি মৃত্যুতে এবং যিনি প্রথমবার জীবন দিয়েছেন, তিনি ছাড়া কারো পক্ষে পুনরায় জীবন দেয়া সম্ভব না।
কেমন লাগবে যদি বলি একুশ শতকেও অনেকটা বিজ্ঞানের ছদ্মবেশে হচ্ছে এমন কিছু যা যেন ঠিক মিশরের মমির আধুনিক সংস্করণ? মৃত ব্যক্তিকে ফিরিয়ে আনার আশায় এক আশ্চর্য প্রচেষ্টা?
১৯৩৯ সালে স্ট্যানলি এবং ম্যাক্স লফার টোবাকো মোজাইক ভাইরাসের প্রোটিন আর নিউক্লিক এসিডকে আলাদা করেছিলেন। দেখা গেছিলো, সে নিউক্লিক এসিড ছিলো RNA ধরণের। DNA-র গঠন দ্বিসূত্রাকার (দুটো সুতা প্যাচানো এরকম গঠন), RNA একসূত্রাকার। উপাদানেও একটু তফাৎ আছে।
জীবকোষে বংশগতির বস্তু হিসেবে সবসময় DNA কাজ করে। RNA-ও কি বংশগতির বস্তু হিসেবে কাজ করতে পারে? ফ্রেঙ্কেল কনরাট এটাই দেখতে চাইছিলেন। তিনি কয়েকটা পরীক্ষা করে দেখলেন।
দেখা গেলো ভাইরাসের প্রোটিন আর নিউক্লিক এসিড আলাদা করলে শুধু প্রোটিন আবরণটা জীবনের কোন লক্ষণ আর দেখায় না, মানে রোগ সৃষ্টি করতে পারে না। কিন্তু নিউক্লিক এসিড অংশটুকুই তামাকের রোগ সৃষ্টি করতে পারে। আরো দেখা গেলো এই যে আলাদা করা নিউক্লিক এসিড আর প্রোটিন, যথাযথ পরিবেশ রেখে সেগুলো মিশ্রিত করা হলে পুনরায় ভাইরাস তৈরি হয়।
আরেকটা পরীক্ষা তিনি করলেন। দুরকমের RNA সুতাবিশিষ্ট টোবাকো মোজাইক ভাইরাস নিলেন তিনি। একটা থেকে RNA আলাদা করে অন্যটার প্রোটিন আবরণের সাথে মিশ্রিত করলেন। এরপর এই হাইব্রিড ভাইরাস দিয়ে সংক্রমণ ঘটালেন। দেখা গেলো নতুন ভাইরাসগুলো যে ভাইরাস থেকে RNA নেয়া হয়েছিলো, ঠিক তার অনুরূপ হচ্ছে।
এই পরীক্ষাগুলোর মূল সিদ্ধান্ত ছিলো ভাইরাসে RNA বংশগতির উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে। ভাইরাসের ক্ষেত্রে, কিছু ভাইরাসে RNA থাকে, আবার কিছু ভাইরাসে DNA থাকে।
তবে আমরা আরেকটা জিনিসও এখানে দেখতে পাই, ভাইরাসের জীবনের লক্ষণ দেখানোকে জীবন আর জীবনের লক্ষণ না দেখানোকে মৃত্যু- এভাবে চিন্তা করার আসলে খুব বেশি কারণ নেই। বরং এটা এক ধরণের জড় পদার্থ, যেটা জীবকোষকে সংক্রমণ করে সেখানে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারে।
ভাইরাসের উৎপত্তি কীভাবে হয়েছে?
যেহেতু জীবন বা মৃত্যু নেই, ভাইরাসের প্রথম উৎপত্তি কখন বা কীভাবে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবে এটা বেশ নিশ্চিতভাবেই বলা যায় বিভিন্ন ভাইরাসের উৎপত্তি এক জায়গা থেকে বা একইভাবে হয়নি, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্নভাবে হয়েছে। ভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে সামনের সারির মতগুলোর মধ্যে প্রত্যাবৃত্তি মত আর কোষীয় উৎপত্তি মত জীবকোষ থেকে ভাইরাসের উৎপত্তির ধারণা দেয়, সহ-বিবর্তন মত জীবকোষের থেকে পৃথকভাবে ভাইরাসের উৎপত্তির কথা বলে।
প্রত্যাবৃত্তি মতবাদ অনুযায়ী ভাইরাসের শুরু পরজীবী কোন জীবকোষ থেকে হয়ে থাকতে পারে। পরজীবী হওয়াতে যেহেতু অন্য কোষীয় অঙ্গাণুগুলো ছাড়াই এটা টিকে থাকতে পারছিলো, বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পর্যায়ক্রমে সে অঙ্গাণুগুলো সব বাদ পড়ে শুধু নিউক্লিক এসিড আর প্রোটিন আবরণ টিকে থেকেছে। কোষীয় উৎপত্তি মত অনুযায়ী ভাইরাস বৃহত্তর কোন কোষ থেকে বের হয়ে আসা DNA বা RNA-র খন্ডাংশ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। অন্যদিকে সহ-বিবর্তন মতবাদ বলছে প্রাণের সূচনার কাছাকাছি সময়ে পৃথকভাবে ভাইরাসের মত নিউক্লিক এসিড তৈরি হয়েছে, যা প্রাণের ওপর নির্ভর করে টিকে আছে।
ভাইরাস কি ল্যাবরেটরীতে তৈরি সম্ভব?
উত্তর হলো, হ্যা। ভাইরাস ল্যাবরেটরীতে তৈরি সম্ভব। আমাদের শুধু রাসায়নিকভাবে পরিকল্পিতভাবে নিউক্লিওটাইডগুলোকে পরপর বসিয়ে যথাযথ নিউক্লিক এসিড তৈরি করতে হবে। এরপর উপযুক্ত জীবকোষে সংক্রমণ করালেই সেখানে প্রতিলিপন ও প্রোটিন আবরণ তৈরি হয়ে ভাইরাসের সংখ্যাবৃদ্ধি হতে থাকবে। As simple as this!
পরের প্রশ্ন- ভাইরাস কি ল্যাবরেটরীতে কখনো তৈরি হয়েছে? উত্তর হলো, হ্যা। ২০০২ সালে, অর্থাৎ লেখার সময় থেকে দুই যুগ আগেই প্রথমবারের মত পোলিওভাইরাসের নিউক্লিক এসিড ল্যাবরেটরীতে তৈরি করা সম্ভব হয়। এধরণের ভাইরাসকে বলা হয় সিনথেটিক ভাইরাস। এক্ষেত্রে মূলত নিউক্লিক এসিডের জিনোম সিকুয়েন্স বা নিউক্লিওটাইডের বিন্যাস কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়, প্রোটিন আবরণ তৈরির কাজটা তারপর সংক্রমিত জীবকোষে ঘটে।
পরের প্রশ্ন- এখানে কি আশঙ্কার কোন জায়গা আছে? উত্তর হলো, হ্যা। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা কখনো কখনো এই প্রশ্নকে আরো জোরদার করেছে। যেমন, ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু-এর জন্য দায়ী ভাইরাসের মূল ভ্যারিয়েন্টকে সংরক্ষিত একটি টিস্যু থেকে ২০০৫ সালে পুনরুৎপাদন করা হয়েছিলো।
পরীক্ষাগারে ভাইরাস তৈরি- এটা একদিকে হয়ত ভাইরাসকে আরো গভীরভাবে বোঝা এবং ভাইরাসের রোগগুলো নিরাময় বা নির্মুলে আমাদের সাহায্য করতে পারে। কিন্তু সত্যি বলতে পৃথিবীতে জীবনের শুরু থেকে এপর্যন্ত অভিজ্ঞতাগুলো আমাদেরকে বাস্তবতা অনেকটাই বুঝতে শিখিয়েছে। আমরা সভ্যতার মুখোশ পড়ে থাকা নির্লজ্জ্ব, নিষ্ঠুর মিথ্যাবাদীদেরকে দেখেছি। কাজেই বায়োলজিকাল অস্ত্র তৈরি বা ব্যবহারের আশঙ্কা অমূলক কিছুই না…
বহিঃসংযোগ
The Origins of Viruses – Nature
Fraenkel Conrat Experiment – Biology Reader
History of virology – Wikipedia
Virus – Wikipedia
The 1918 flu virus is resurrected – National Library of Medicine




