লিনাক্স ইউজারের চোখে উইন্ডোজ ১১: কতটা ভালো করেছে মাইক্রোসফট?

অনেক বছর ধরেই দৈনন্দিন ব্যবহারে আমি লিনাক্স ব্যবহার করে আসছি এবং এখনো তাই, তবে কিছু প্রয়োজনে এর সাথে ডুয়াল বুটে উইন্ডোজ রয়েছে বর্তমানে। উইন্ডোজ ১১-র সাথে আমার খুব বেশি অভিজ্ঞতা এর আগে হয়নি। যাহোক, যেহেতু মাইক্রোসফট ফ্রি আপগ্রেড অফার করছে উইন্ডোজ ১০ থেকে, আর আমার বর্তমান ল্যাপটপ উইন্ডোজ ১১ চালানোর ক্রাইটেরিয়াগুলোও পূরণ করে, তাই আপগ্রেড করে ফেললাম।

উইন্ডোজ ১১ সিকিউর বুট এনাবল থাকা জরুরী। ফিডোরা ইন্সটলের সময় ডিজেবল করেছিলাম, আপগ্রেড করার আগে অবশ্যই এনাবল করে নিতে হয়েছে এবং এতে ফিডোরাতে কোন সমস্যা হয়নি। আপগ্রেডের জন্য বেশ ভালোই সময় নিয়েছে, তার ওপর ৯৫% আপগ্রেড ইন্সটলের পর ভুলে Pause updates ক্লিক করে ফেলেছিলাম। এরপর Resume করতে শুরুর থেকে শুরু হলো, অবশ্য ডাউনলোড ও ইন্সটল দুটোই পরেরবারে আগের থেকে দ্রুততর মনে হয়েছে।

উইন্ডোজ ১১-তে আপগ্রেড করে প্রথমেই যেটা খেয়াল করলাম, তা হলো দেখতে ঠিক তেমনটা লাগছে না, যেমনটা অনলাইনে ও অন্য কম্পিউটারগুলোতে দেখেছি। তবে যা বুঝলাম, দোষটা উইন্ডোজ ১১-র না, লেনোভো ল্যাপটপের ডিফল্ট ওয়ালপেপারের সাথে লাইট মোডের কম্বিনেশনটা খুব আদর্শ নয়। তবে এটা বদলে নেয়ার পর সত্যিই উইন্ডোজ ১১-র লুক খুবই স্টানিং। উইন্ডোজ ১১-তে বেশ আই-ক্যাচি এনিমেশনের ছোঁয়া রয়েছে। সামগ্রিক রেসপোন্সিভনেসের উন্নতি চোখে পড়ার মত।

কিন্তু এর মাঝে কম্পিউটার বন্ধ করে চালু করার সময় যে জিনিসটা খেয়াল করেছিলাম, সত্যি বলতে তার জন্য আমি বেশ প্রস্তুত ছিলাম, আমার ফিডোরার গ্রাব মেনুু উধাও হয়ে গেছে, সোজা উইন্ডোজ ১১ আসে। গ্রাব রেসকিউ টাইপ কিছু করতে হবে মনে হলেও শুধু বায়োস থেকে বুট অর্ডারে ফিডোরা আগে আনতে হয়েছে, এখন গ্রাব মেনুতে ফিডোরা/উইন্ডোজ অপশন আসে।

আগের মত এবারও উইন্ডোজ কন্ট্রোল প্যানেলের মায়া ছাড়তে পারেনি। সেটিংস এখন যথেষ্ট সমৃদ্ধ, কিন্তু এখনো কিছু কিছু কাজে পুরনো কন্ট্রোল প্যানেলে খোঁজ নিতে হয়। যেমন ফাস্ট স্টার্টআপ চালু আছে কিনা চেক করতে গিয়েছিলাম, ওটা সেটিংসে নেই, কন্ট্রোল প্যানেলে আছে। উইন্ডোজ ৮, ১০ এর পর ১১-তে এসেও এটা বদলায়নি।

উইন্ডোজে এরকম বিষয়গুলো নতুন না। এবার এখানে নতুন সংযোজন হলো রাইট ক্লিক মেনুতে Show more options সংযোজন, যেখানে রাইট ক্লিক মেনুটি উইন্ডোজ ১১-এর নতুন মেনু, আর আদতে Show more options হলো উইন্ডোজ ১০-এর মেনু। ডেস্কটপে আবার দুটোর মধ্যে অপশনের একটাও কমবেশি নাই, মানে লিগ্যাসি মেনুতে Show more options অপশনটি নেই এটা বাদে। অন্যত্র অবশ্য সিমপ্লিফিকেশনের জন্য নতুন মেনুতে কিছু অপশন নেই, সেক্ষেত্রে তারা সেগুলো আলাদাভাবে সাবমেনুতে দিতে পারতো, তাই বলে দুরকম মেনু কেন ভাই?

নতুন মেনুতে কাট-কপি-পেস্ট-ডিলিট প্রভৃতি এখন আইকন-অনলি করা হয়েছে। আরেকটা ব্যাপার দেখলাম, ডেস্কটপে This PC, Control Panel, Recycle Bean আইকনগুলোতে রাইট ক্লিকে সরাসরি লিগ্যাসি মেনু আসে, অন্য ডেস্কটপ এন্ট্রিগুলোতে নতুন মেনু। অদ্ভুত!

ফাইল ম্যানেজারের ন্যাভিগেশন বারে পরিবর্তন চোখে না পড়া অনেকটা অসম্ভব। এখন মূলত রাইট ক্লিক মেনুর বিভিন্ন অপশন সেখানে প্রদর্শিত হয়, কিছু কম-বেশিসহ। উইন্ডোজ ১০-এর মত রিবন আর থাকছে না। আর আইকন থিমও দারুণ শাইনি করেছে তারা ডিজাইন ল্যাঙ্গুয়েজের সাথে মিল রেখে।

বহু জায়গায় লিগ্যাসি ছোঁয়া এখনো দেখা যাবে, যা বাকি শাইনি ডিজাইনের সাথে যায় না। এগুলো আবার ডার্ক মোডকেও সম্মান করে না, তবে সেখানেও তফাৎ আছে। যেমন লিগ্যাসি মেনু ডার্ক মোড ঠিকই নেয়, কন্ট্রোল প্যানেলে ন্যাভিগেশন বার ডার্ক হয়, অন্য বিভিন্ন অ্যাপ পুরোটাই লাইট। উইন্ডোজের ইনকন্সিস্টেন্সি নতুন কিছু নয়, তবে উইন্ডোজ ১১ এখানে সমাধান তো নয়ই, বরং বিষয়টা আরো প্রকট করেছে মনে হচ্ছে।

এলিফেন্ট ইন দা রোড, সেন্টারাইজড টাস্কবার আর স্টার্ট মেনু নিয়ে কিছু বলিনি এখনো। তার আগে বুঝছিনা টাস্কবারে তারিখ আর সময় রাইট অ্যালাইন করলো কেন সেন্টারের বদলে, আমার কাছে ভালো লাগেনি। অ্যাসিমেট্রিফোবিয়া থাকলে ডানে নোটিফিকেশন এরিয়া, বামে ফাঁকা বিষয়টা পছন্দ না হতে পারে, সেক্ষেত্রে মাইক্রোসফট টাস্কবার অ্যালাইনমেন্ট লেফট করার সুযোগ রেখেছে।

নতুন স্টার্ট মেনুর কথা বললে এটা সুন্দর, তবে সবচেয়ে কনভিনিয়েন্টও মনে হয়নি। সাম্প্রতিক যুক্ত বা ব্যবহৃত আইটেমগুলো নিয়ে রিকমান্ডেড সেকশনের সংযোজন বেশ ভালো। তবে সব অ্যাপ ব্রাউজ করতে একটা এক্সট্রা ক্লিক প্রয়োজন হয় উইন্ডোজ ১০-এর থেকে, যেহেতু সেখানে লাইভ টাইলস ও অল অ্যাপস পাশাপাশি ছিলো। এমনিতে আমার পছন্দের মেনুর কথা বললে তা হলো কেডিই-র বর্তমান সিম্পলিফায়েড অ্যাপ্লিকেশন লঞ্চার

সার্চ বক্সের UX উইন্ডোজ ১০-এর মতই, তবে স্টার্ট মেনু থেকে সার্চে ট্রানজিশন আগের থেকে স্মুথ এবং সার্চও আগের থেকে ফাস্ট ও রেসপোন্সিভ লেগেছে। সার্চ বক্সে হোভার করলে রিসেন্টলি ক্লোজড অ্যাপগুলো দেখায়, তবে টাস্কবার লেফটে থাকলেও এটা সেন্টারে আসছে, মাইনর বাগ, হোপফুলি আপডেটে ঠিক হবে।

টাস্ক ভিউ আগের থেকে বহুগুণ বেটার হয়েছে এবারে। লিনাক্সে অনেক আগে থেকে প্রচলিত হলেও উইন্ডোজ প্রথমবারের মত একাধিক ভার্চুয়াল ডেস্কটপ ব্যবহারের সাপোর্ট এনে দেয় উইন্ডোজ ১০-এ। তবে সে তুলনায় উইন্ডোজ ১১-তে থেকে অনেক কনভিনিয়েন্ট।

Widgets উইন্ডোজ ১১-তে একটা নতুন সংযোজন, যেটা বিশেষ কাজের মনে হয়নি। এটা উইন্ডোজ ৭-এর মত ডেস্কটপ উইজেট না। আবহাওয়া, স্টক মার্কেটের অবস্থা, স্পোর্টস আপডেট এরকম কিছু জিনিসপাতি, সাথে নিউজ দেখায় এখানে। উইজেট সিলেকশনের সুবিধা মাইক্রোসফটের ১১টি উইজেটেই বর্তমানে সীমাবদ্ধ। তারপর মাইক্রোসফট টিমসের চ্যাট একটি আইটেম ছিলো, যেহেতু টিমস ব্যবহার করি না, তাই ডিজেবল রেখেছি।

ডানদিকে নোটিফিকেশন ও সময়-তারিখ সেকশনে আসলে বেশ বড় পরিবর্তন এসেছে উইন্ডোজ ১১-তে। ভলিউম, ব্যাটারী ও কুইক সেটিংস একটি মেনুতে এবং নোটিফিকেশন আরেকটি মেনুতে আনা হয়েছে।

সেটিংস রিডিজাইন করা হয়েছে উইন্ডোজ ১১-তে। এখনো যদিও কন্ট্রোল প্যানেলের মায়া উইন্ডোজ ছাড়তে পারেনি, তবে সেটিংসে প্রচুর অপশনস রয়েছে এবং সেগুলো সুবিন্যস্ত। আমার কাছে সেটিংসের রিডিজাইন ভালো লেগেছে।

ডেস্কটপজুড়ে বিভিন্ন ইফেক্টের সমাহারে আরেকটা চিন্তা চলে আসে। রিসোর্স ইউসেজ। আর এখানে যদি আপনি মনে করেন উইন্ডোজ ১১ প্রচুর রিসোর্স খাবে, তাহলে একচুয়ালি আপনি ঠিক ধরেছেন। স্টার্টআপে ৪ জিবি র‌্যাম দখল করে নেয়া কম কথা নয়। যদিও র‌্যামের বরাদ্দ অনুযায়ী আধুনিক সিস্টেমগুলো ম্যানেজ করে, তবে ৮ জিবির কম র‌্যামে উইন্ডোজ ১১ সম্ভবত খুব ভালো নাও চলতে পারে। তবে যথেষ্ট রিসোর্স থাকলে ১০ থেকে ‌১১ বেশি স্মুথ লেগেছে।

আমি জানি উইন্ডোজ ১১-র অনেকগুলো হাইলাইটেড ব্যাপার নিয়ে আমি কথা বলিনি, অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ সাপোর্টের মত হইচই ফেলা ব্যাপারও এর মধ্যে আছে। আসলে নতুন ফিচারগুলো তুলে ধরা এই পোস্টের টপিক ছিলো না, আমরা কমবেশি হয়ত ধারণা রাখি, এবং আরো জানতে হলে মাইক্রোসফট ডকুমেন্টেশনের আর্টিকেলটি দেখে নিতে পারেন।

উইন্ডোজ ১০-ই মাইক্রোসফটের শেষ ওএস হবে কিনা তা নিয়ে গুঞ্জন ছিলো বেশ। উইন্ডোজ ১১ চালাতে যেহেতু TPM 2.0-এর মত লেটেস্ট ফিচারসহ ১০ এর মিনিমাম রিকুয়ারমেন্ট থেকে খানিকটা উন্নত হার্ডওয়্যার প্রয়োজন, কাজেই জাস্ট ১০-এর একটি আপডেট হিসেবে এর আগমন সম্ভবপর ছিলো না। আর যেহেতু মাইক্রোসফট একটি ওএসের পর নতুন আরেকটি খুব দ্রুত নিয়ে আসে না, ১১ সামনের দিনে আরো বেটার হয় উঠবে এমনটা আশা করাই যায়। যেমনটা উইন্ডোজ ১০ এর বেলাতেও হয়েছে।

অন্য অপারেটিং সিস্টেমগুলো থেকে উইন্ডোজ ১১ কিছু কিছু অনুপ্রেরণা নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে ডিপিন ও কেডিই প্লাজমা ডেস্কটপের সাথে উইন্ডোজ ১১-র মিল পুরোপুরি কাকতালীয় বলে আমার বোধ হয়নি। এটা খারাপ কিছু না, সব ওএসই বিভিন্ন দিকে অন্যদের থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে থাকে, আর প্রযুক্তি এভাবেই ধাপে ধাপে উন্নত হয়, যেখানে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অবদান থাকে অনেকেরই। তবে যদি উইন্ডোজ আসলেই ইন্সপায়ার্ড হয়ে থাকে, তবে তারা ঠিক জায়গাতেই ইন্সপাইরেশন নিয়েছে মনে করি।

উইন্ডোজ ১১-তে পরিবর্তন ও সংযোজনগুলো চমৎকার, সামগ্রিকভাবে এটা বেটার ফিল হয়, যেমনটা একটা আপডেট ভার্সনের হওয়া উচিৎ। ব্লার ইফেক্টের ব্যবহার, স্মুথ এনিমেশনসহ এর লুক স্টানিং। তবে বিশেষ করে লিগ্যাসি জিনিসগুলোর ক্ষেত্রে কনসিস্টেন্সি বজায় থাকেনি একদমই, যেখানে তারা বেটার করতে পারতো। আর এর বাইরে এটা একটা উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম, যেটা মাইক্রোসফট ডেভেলোপ করেছে, এবং এটা উইন্ডোজ ১০ এর সাক্সেসর।

আমার মতামত কী? লিনাক্স আর উইন্ডোজের কিছু মেজর পার্থক্য আছে, লিনাক্সের রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে উইন্ডোজ ১১ অবশ্যই আমার চয়েস হবে না এবং আমার প্রাইমারী ওএস উইন্ডোজ হওয়ারও সম্ভাবনা আপাতত নেই। তবে একটি উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে শাইনি ও গর্জিয়াস উইন্ডোজ ১১-আমার কাছে সত্যি বলতে দারুণ লেগেছে, তবে বেটার করার স্কোপ অবশ্যই ছিলো।

উইন্ডোজ ভিস্তার ঘটনার পুনরাবৃত্তির একটা সম্ভাবনা অবশ্য দেখি উইন্ডোজ ১১-র বেলায়। উইন্ডোজের অন্যতম ব্যর্থ এই ওএসের ব্যর্থতার গুরুত্বপূর্ণ একটা কারণ ছিলো সেটা তার সময় থেকে এগিয়ে ছিলো, অর্থাৎ সে সময়ের বেশিরভাগ পিসি ভিস্তা যথাযথভাবে চালাতে সক্ষম ছিলো না। এখন সময়টা যদিও ঠিক সেরকম না, তবে যাদের পিসি কিছুটা লোয়ার স্পেকের, তাদের জন্য গল্পটা হয়ত অনেকটা তেমনি…

One comment

  1. আমি sniping টুল দিয়ে সরাসর স্ক্রিন শট নিতে পারছিনা

Leave a Reply

Your email address will not be published.