WPS অফিস: দারুণ একটি ফ্রি অফিস সফটওয়্যার (লিনাক্স/উইন্ডোজ/ম্যাক)

WPS অফিস জনপ্রিয় একটি অফিস সফটওয়্যার। চীনের বেইজিংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান Kingsoft কতৃক ডেভেলোপকৃত এই সফটওয়্যারটির নাম একসময় ছিলো Kingsoft Office। এটা ক্রস প্লাটফর্ম সফটওয়্যার- উইন্ডোজ, লিনাক্স, ম্যাক, আইওএস ও অ্যান্ড্রয়েডের জন্য এভেইলেবল, একটি অনলাইন ক্লাউড সংস্করণও রয়েছে। তবে এই লেখাতে স্মার্টফোন ও ওয়েব ভার্সন আলোচ্য নয়।

WPS অফিস প্যাকেজে রয়েছে- Writer, Presentation, Spreadsheet এবং PDF। ফ্রি অফিস সফটওয়্যার হিসেবে WPS অফিস জনপ্রিয়। এটির প্রিমিয়াম সংস্করণ রয়েছে, যেখানে পিডিএফ এডিটিং ও ম্যানেজমেন্ট, ক্লাউডভিত্তিক বিভিন্ন ফিচার ও আরো কিছু সুবিধা রয়েছে। তবে অফিস স্যুট হিসেবে ফ্রি ভার্সনে কোন সীমাবদ্ধতা রাখা হয়নি। প্রসঙ্গত, এটা একটা প্রপারইটরী সফটওয়্যার, ওপেন সোর্স নয়। এমনকি এর উইন্ডোজ ভার্সনে বিজ্ঞাপন সমর্থিত, যদিও কোন কারণে WPS অফিসের প্রিমিয়াম সংস্করণ বা রেফারালের ব্যানার ছাড়া কোন বিজ্ঞাপন আমার চোখে পড়েনি।

WPS অফিস সম্পর্কে এক কথায় বললে এটা বলা চলে মাইক্রোসফট অফিসের একটি ক্লোন। মাইক্রোসফট অফিস ব্যবহারকারীদের জন্য WPS অফিস একদমই অপরিচিত মনে হবে না। যেন মাইক্রোসফট অফিসেরই আরেকটি ভার্সন এটা। বেসিক থেকে এডভান্সড অধিকাংশ ইউজারের চাহিদা পূরণ করতে WPS অফিস সক্ষম।

সবচেয়ে জনপ্রিয় অফিস সফটওয়্যার মাইক্রোসফট অফিস পেইড ও লিনাক্স সমর্থিত না হওয়াতে অনেকেই একটি ফ্রি অল্টারনেটিভ খুঁজে থাকেন। এক্ষেত্রে বেশকিছু অপশন রয়েছে- LibreOffice, OnlyOffice, OpenOffice, WPS Office ও FreeOffice সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি।

WPS অফিসের বিশেষত্ব হলো এর ইন্টারফেস ও ব্যবহারবিধি মাইক্রোসফট অফিসের সবচেয়ে কাছাকাছি এবং অনেকের মতে মাইক্রোসফট অফিসের সাথে এর কম্প্যাটিবিলিটি অল্টারনেটিভগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো। কয়েকটি ফাইল আমি নিজেও একাধিক সফটওয়্যারে ট্রাই করে দেখেছি এবং অনেক ক্ষেত্রে WPS বেটার রেজাল্ট দিয়েছে।

WPS অফিস মাইক্রোসফট অফিসের ফাইল ফর্মেটগুলো বাই ডিফল্ট ব্যবহার করে। অর্থাৎ .docx, .xlsx, .pptx। এছাড়া .doc, .xls, .ppt, .txt, .htm প্রভৃতি ফর্মেটে সেভ করা এবং পিডিএফ হিসেবে এক্সপোর্ট করা সমর্থন করে। তবে লিব্রাঅফিস বা ওপেন অফিসে ব্যবহৃত ওপেন ডকুমেন্ট ফর্মেটগুলো এখানে মূলত সমর্থিত না, যদিও এর জন্য একটি অ্যাডঅন রয়েছে।

WPS ট্যাবড ইন্টারফেস ব্যবহার করে। দুটি উইন্ডো ম্যানেজমেন্ট মোড রয়েছে, একই উইন্ডোতে ডকুমেন্ট, স্প্রেডশিট, প্রেজেন্টেশন, পিডিএফ ব্যবহার করতে চাইলে অল-ইন-ওয়ান অথবা আলাদা উইন্ডোর জন্য মাল্টি মডিউল। একসাথে একাধিক ফাইল নিয়ে কাজ করার সময় ট্যাব ফিচারটি সুবিধাজনক।

WPS অফিসের ইন্টারফেস বেশ সুন্দর, আমি জানি না কেন, চাইনিজ সফটওয়্যারগুলোর ইউআই সব সময়ই একটু অন্যরকম সুন্দর হতে দেখা যায়। মাইক্রোসফট অফিসের অনুরূপ রিবন ইন্টারফস ব্যবহার হয়েছে এখানে। ডিজাইনের তফাৎ থাকলেও অপশনগুলোর বিন্যাস মাইক্রোসফট অফিসের মতই। প্রায়সময়ই মাইক্রোসফট অফিসের কার্যপদ্ধতি হুবহু WPS অফিসে প্রযোজ্য।

উইন্ডোজ ভার্সনের জন্য চমৎকার কিছু থিম রয়েছে

উইন্ডোজ ভার্সনে স্কিন সেন্টারে চমৎকার সব থিম রয়েছে, তবে দুঃখজনকভাবে লিনাক্স ভার্সনে মূলত শুধু হেডার কালার/ব্যাকগ্রাউন্ড পরিবর্তন সম্ভব। তবে ইউআই ফন্ট পরিবর্তন ও স্কেলিং সুবিধা আছে, যেটা ভালো। কোন কারণে লিনাক্স ভার্সনে স্কিন সেন্টারটি চাইনিজ ভাষা প্রদর্শন করে। আরো দুয়েকসময়ে টুকটাক চাইনিজ লেখা চোখে পড়তে পারে।

WPS অফিস মূলত সিস্টেম GTK বা Qt থিমকে ফলো করে না। তাই অন্য অ্যাপগুলোর সাথে এর লুক কনসিস্টেন্ট হবে না। এছাড়া বিশেষ করে লিনাক্স সিস্টেমে ডার্ক থিম থাকলে কিছু জায়গায় অসামঞ্জস্যতা দেখা যেতে পারে। যেমন, ডার্ক থিমের সাথে ফাইল ওপেনিং ডায়ালগ এরকম দেখাচ্ছে-

বাংলা লেখা WPS Office অনেকাংশে সমর্থন করে। ANSI এনকোডিংয়ে লেখার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বর্ণের পরে অযাচিত স্পেস চলে আসে, যেকারণে বিজয় কীবোর্ড ব্যবহার করে লেখার জন্য এটা উপযুক্ত নয়। ইউনিকোডে লেখার ক্ষেত্রে লিনাক্স থেকে স্বচ্ছন্দ্যে লিখতে পেরেছি। একাধিক ডিস্ট্রোতে বিভিন্ন সময়ে ট্রাই করেছি, কখনো সমস্যা হয়নি।

উইন্ডোজে আমি বর্তমানে বর্ণ কীবোর্ড ব্যবহার করছি, যেখানে দুঃখজনকভাবে WPS অফিসে লেখা যাচ্ছিলো না। এছাড়া উইন্ডোজ ও অভ্র কীবোর্ড ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে একটা ওয়ার্কঅ্যারাউন্ড অনুসরণ করতে হবে, যেটা আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে একজন শেয়ার করেছিলেন। অভ্র সেটিংস থেকে Locale Bangla (Bangladesh) সেট করে নিতে হবে।

ফন্টের বিষয়ে WPS অফিস একটু খুঁতখুতে স্বভাবের, বাংলা লিখতে হলে প্রপার বাংলা ফন্ট ব্যবহার করতে হবে এবং ইংরেজি লিখতে হলে ইংরেজি। নিচের ছবিতে WPS Office ও LibreOffice-এ একই ফাইল পাশাপাশি দেখানো হয়েছে, যেখানে WPS অফিস শুধু তখনই প্রপারলি লেখা প্রদর্শন করে যখন সে ভাষার জন্য অ্যাপ্রোপিয়েট ফন্ট নির্বাচিত থাকে। ছবিতে একই ফাইল WPS অফিস ও লিব্রে অফিসে পাশাপাশি দেখানো হয়েছে-

প্রসঙ্গত, মূল টিমের পরিবর্তে পৃথক একটি কমিউনিটি লিনাক্স ভার্সনটি মেইনটেন করত, যাদেরকে WPS সোর্স কোড প্রদান করত এবং লিনাক্স ভার্সনের আলাদা একটি ওয়েবসাইট ছিলো। বর্তমানে আলাদা ওয়েবসাইট নেই, তবে এখনো মূলত উইন্ডোজ ভার্সনকে লিনাক্সে পোর্ট করা হয়, লিনাক্সসেন্ট্রিক ডেভেলোপমেন্ট না, এটা বোঝা যায়।

লিনাক্স ভার্সনটিতে অনলাইন ও ক্লাউডভিত্তিক ফিচারে কমতি রয়েছে। লিনাক্স ভার্সনে অনুপস্থিত ফিচারগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ক্লাউড ব্যাকআপ, অনলাইন টেমপ্লেট এবং পিডিএফ সংক্রান্ত কিছু টুলস। একইসাথে সম্ভবত লিনাক্স ভার্সনে বিজ্ঞাপনেরও উপস্থিতি নেই। এছাড়া লিনাক্সের জন্য প্রিমিয়াম ডেস্কটপ সংস্করণ নেই। তবে অনলাইন টেমপ্লেটপিডিএফ টুলসগুলো ওয়েব ব্রাউজার থেকে এভেইলেবল।

উইন্ডোজ ভার্সনে রয়েছে সরাসরি অনলাইন টেমপ্লেট ব্যবহারের সুবিধা

উইন্ডোজের জন্য একটি প্রিমিয়াম ফিচার লিনাক্স ভার্সনে ফ্রি-তে থাকছে- প্রেজেন্টেশনে ভয়েস ইনপুটসহ প্লেয়ার স্ক্রিন ক্যাপচার সুবিধা। ক্লাউড ব্যাকআপ না থাকলেও লোকাল ব্যাকআপ রয়েছে, ডকুমেন্টের ব্যাকআপগুলো অটোমেটিকলি নির্দিষ্ট ডিরেক্টরীতে সেভ থাকবে।

বাই দা ওয়ে, WPS অফিসে কিন্তু ওয়েব ব্রাউজিং-ও করা যায়। উইন্ডোজে ফাইলে থাকা বিভিন্ন লিঙ্ক বা WPS-এর ওয়েবসাইট সরাসরি এখানে একটি ট্যাবে ওপেন করা যায়, তবে কাস্টম ইউআরএলে যাওয়া যায় না। লিনাক্সে একটা নরমাল ব্রাউজারের মত যেকোন ওয়েবসাইট যাওয়া যায়। তবে প্রচ্চুর ইস্যুর দেখা মিলতে পারে, রেগুলার ব্যবহারের উপযোগী নয়।

এহেম… ওয়েব ব্রাউজার?

মাইক্রোসফট অফিসে যে ফিচারগুলো অধিকাংশ ইউজাররা ব্যবহার করে অভ্যস্থ, সম্ভাবনা খুব কম যে তার কোনটি WPS অফিসে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

প্রেজেন্টেশনের ক্ষেত্রে ডিজাইন টেমপ্লেটের সংখ্যা বেশ সীমিত, মাইক্রোসফট অফিসের জন্য তৈরি টেমপ্লেট ফাইল ইমপোর্ট করা যায়। মাইক্রোসফট অফিসের সাথে তুলনা করলে তত বেশি এক্সাইটিং ট্রানজিশন ইফেক্ট নেই। লিনাক্সে ট্রানজিশনে স্মুথনেসের একটু ঘাটতি আছে, যদিও উইন্ডোজে বাটার স্মুথ। তবে এনিমেশন ইফেক্ট রয়েছে অনেক ধরণের।

সর্বোপরি, অনেক দিক থেকেই WPS অফিস বেশ চমৎকার অফার করছে। লিনাক্সে বিশেষ করে কিছু সীমাবদ্ধতা যদিও রয়েছে, তবে তা মূলত এক্সট্রা ফাংশনালিটিতে, কোর ফিচারে নয়, কাজেই তা খুব একটা বড় সমস্যা না। মাইক্রোসফট অফিস থেকে অন্য অফিস সফটওয়্যারে একটা ইজি ট্রানজিশনের জন্য WPS অফিস সেরা অপশন হতে পারে।

ব্যক্তিগতভাবে আমি লিব্রাঅফিস ব্যবহার করি, লিনাক্স সিস্টেমে যেটা অনেক বেশি কনসিস্টেন্ট এবং সম্পূর্ণ ফ্রি ও ওপেন সোর্স। তবে এতে অভ্যস্থ হওয়া তুলনামূলক সময়সাপেক্ষ, মাইক্রোসফট অফিসের সাথে কম্প্যাটিবিলিটিতেও সেরা নয়। ফ্রি অফিস কিংবা অনলি অফিসের বাংলা সমর্থন না থাকা অনেকের জন্যই এগুলোকে তালিকা থেকে বাদ করে দেয়।

তাই মাইক্রোসফট অফিসের একটা অল্টারনেটিভ খুঁজলে- যেটা মাইক্রোসফট অফিসের মতই কাজ করবে এবং মাইক্রোসফট অফিসের ফাইলগুলোর সাথে ভালোভাবে কম্প্যাটিবল হবে, ব্যবহার সহজ, বাংলা লেখা সম্ভব এবং ফিচারের দিকে পূর্ণতা রয়েছে, এরকম কিছু চাইলে WPS অফিস একরকম বিকল্পহীন বলা যায়।

অবশ্যই এর ড্রব্যাক কিছু নেই এরকম না। মূল তিনটি প্রোগ্রাম (ও পিডিএফ রিডার) ছাড়া ডাটাবেজসহ অন্য অফিস রিলেটেড প্রোগ্রামগুলো WPS অফিসে অন্তর্ভুক্ত নয়। উইন্ডোজ ভার্সনে বিজ্ঞাপন সমর্থিত থাকা কিংবা লিনাক্স ভার্সনে চৈনিক লেখার উপস্থিতি অনেকের অস্বচ্ছন্দের কারণ হতে পারে। বাংলা সমর্থনে WPS পারফেক্ট না।

তবে বরাবর-ই পৃথিবীতে সবকিছু ভালোমন্দ মিলিয়েই হয়ে থাকে। আর এখানে পারফেক্ট জিনিসটা খুঁজে পাওয়া দূরাশা। সব মিলিয়ে অনেকের জন্য WPS অফিস উপযুক্ত হতে পারে।

2 Comments

    • এডসেন্স কিংবা অন্য কোন তৃতীয় পক্ষের এড নেটওয়ার্কের বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে এমন কোন বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে ইসলামে অনুমোদিত অথবা আমাদের সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একারণে এডসেন্সসহ তৃতীয় পক্ষের বিজ্ঞাপন নেটওয়ার্কগুলো নিয়নবাতি বিজ্ঞাপন নীতিমালা অনুসারে ব্যবহার হয় না। আমাদের বিজ্ঞাপন নীতিমালা: https://neonbati.com/neonadpolicy/

Leave a Reply

Your email address will not be published.