অনলিঅফিস: কোলাবোরেটিভ ফিচারসহ এন্টারপ্রাইজ রেডি অফলাইন অথবা ক্লাউডভিত্তিক অফিস সফটওয়্যার

অনলিঅফিস একটি এন্টারপ্রাইজ-রেডি, ক্রস প্লাটফর্ম ও ওপেন সোর্স অফিস সফটওয়্যার। এটা অনলাইন ক্লাউডভিত্তিক অথবা অফলাইনে ব্যবহারযোগ্য। অনলিঅফিসের অনন্যতা এর ক্লাউডভিত্তিক ও কোলাবোরেটিভ ফিচার এবং এন্টারপ্রাইজ সাপোর্টে, কিন্তু সেইসাথে শুধুমাত্র একজন রেগুলার ইউজারের জন্যও যথেষ্ট কারণ রয়েছে মাইক্রোসফট অফিস, লিব্রাঅফিস, WPS অফিস কিংবা গুগল ডকসের মত বিকল্পগুলোর পরিবর্তে অনলিঅফিসকে বেছে নেয়ার।

ইন্ডিভিজুয়াল, এডুকেশনাল অথবা ৫ জন পর্যন্ত কোলাবোরেটিভ ইউসেজের জন্য অনলিঅফিস সম্পূর্ণ ফ্রি, যেখানে তারা ২ জিবি ক্লাউড স্টোরেজও প্রদান করে। তবে হোম সার্ভার, বৃহত্তর বিজনেস ইউসেজ ও ডেভেলোপারদের জন্য জন্য বিভিন্ন প্যাকেজ অনলিঅফিস অফার করে। অনলিঅফিস নিজস্ব সার্ভারে ডিপ্লয় ও বিভিন্ন প্লাটফর্মের সাথে ইন্ট্রিগ্রেশন সুবিধা আছে।

যাইহোক, এই লেখাতে অনলিঅফিসকে একজন সাধারণ ইউজারের পার্সপেক্টিভ থেকে উপস্থাপন করা হবে, এবং এই দৃষ্টিকোণে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।

অনলিঅফিসের বেশকিছু সংস্করণ রয়েছে। অনলিঅফিস ডকস- মূল ক্লাউডভিত্তিক অফিস স্যুট। অনলিঅফিস ওয়ার্কস্পেস- ডকসের সাথে আরো বিভিন্ন মডিউল ইন্ট্রিগ্রেট করে। এবং রয়েছে অফলাইনে ব্যবহারের জন্য ডেস্কটপ ও মোবাইল অ্যাপস।

অনলিঅফিস ডকসের মধ্যে ডকুমেন্ট, স্প্রেডশিট ও প্রেজেন্টেশন এডিটর রয়েছে। একটি ফর্ম ক্রিয়েটর এবং বেসিক পিডিএফ ভিউয়ার-ও সাথে আছে। ওয়ার্কস্পেস সংস্করণে ওয়ার্কফ্লো ম্যানেজমেন্টের জন্য প্রজেক্ট, মেইল, কন্টাক্টস, ক্যালেন্ডার, ফিডসহ বিভিন্ন মডিউল যুক্ত আছে।

অনলিঅফিস পার্সোনাল ও অনলিঅফিস ওয়ার্কস্পেস

যদি আপনি একজন ইন্ডিভিজুয়াল ইউজার হয়ে থাকেন- অর্থাৎ কোলাবোরেটিভ টিম ওয়ার্ক বা এধরণের প্রয়োজন না থাকে, সেক্ষেত্রে অনলিঅফিস পার্সোনাল ব্যবহার করতে পারেন। এর সাথে ২ জিবি ক্লাউড স্টোরেজ রয়েছে। এজন্য অনলিঅফিস পার্সোনাল-এর অ্যাকাউন্ট তৈরি করে নিতে হবে, যেটা সম্পূর্ণ ফ্রি।

অন্যদিকে অনলিঅফিস ওয়ার্কস্পেস ৫ জন পর্যন্ত ইউজারের টিমের জন্য স্টার্টআপ প্যাকেজ সম্পূর্ণ ফ্রি। এখানে অনলিঅফিস ডকসের সাথে আরো মডিউল ও কোলাবোরেটিভ ফিচার রয়েছে। ওয়ার্কস্পেস সংস্করণে তারা একটি পোর্টালের জন্য ২ জিবি ক্লাউড স্টোরেজ প্রদান করে। পাশাপাশি হোম সার্ভার, বৃহত্তর বিজনেস বা এন্টারপ্রাইজ প্রয়োজন মেটানোর জন্য তাদের পেইড প্যাকেজ আছে। অনলিঅফিস ওয়ার্কস্পেসের জন্য রেজিস্ট্রেশন করা যাবে এখান থেকে। অনলিঅফিস ওয়ার্কস্পেসে রেজিস্ট্রেশনের সাথে প্রথম ৩০ দিন বিজনেস ফিচারগুলোর ট্রায়াল রয়েছে।

ক্লাউডভিত্তিক অফিস

অ্যাকাউন্ট তৈরির পর অনলিঅফিস ব্যবহার করার জন্য অ্যাপ ইন্সটল করা জরুরী নয়, কেননা এটি সম্পূর্ণরূপে মোবাইল ও ডেস্কটপ ওয়েব ব্রাউজার থেকে ব্যবহারযোগ্য। মোবাইল ও ডেস্কটপ অ্যাপ থেকে মোবাইল ও ডেস্কটপ ওয়েব ইন্টারফেস ও ফিচারের মূলত কোন তফাৎ নেই। তবে ওয়েব সংস্করণে প্রি-ইনক্লুডেড ফন্ট কালেকশন ছাড়া অন্যান্য ফন্ট যুক্ত করার কোন অপশন খুঁজে পাইনি। এছাড়া এটির এক্সপ্রেরিয়েন্স হুবহু অ্যাপের অনুরূপ, সব ফিচারসহ। অবশ্য প্রতিবার লোড হওয়া যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ হতে পারে সাধারণ গতির ইন্টারনেট সংযোগে।

ডেস্কটপ ও মোবাইল অ্যাপস

বেশিরভাগ ইউজারের জন্য সম্ভবত ডেস্কটপ বা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করাটাই বেশি কনভিনিয়েন্ট- কেননা এটা সহজে এক্সেসেবল, অফলাইনে ব্যবহারযোগ্য এবং অ্যাকাউন্ট তৈরির প্রয়োজন নেই। অনলিঅফিসের ডেস্কটপ ও মোবাইল অ্যাপ সম্পূর্ণ ফ্রি এবং ওপেন সোর্স। অ্যাপ থেকে অনলিঅফিস ব্যবহারের জন্য কোন অ্যাকাউন্ট তৈরির আবশ্যকতা নেই, তবে যদি ক্লাউডভিত্তিক কোন অনলিঅফিস অ্যাকাউন্ট থাকে, তার সাথে কানেক্ট করার সুবিধা আছে।

ডাউনলোড

অনলিঅফিস ডকস

বাংলা সমর্থন

বাংলা সমর্থনের বিষয়টি শুরুর দিকে আনছি, কেননা আমার নিজের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- এবং এই পোস্ট লেখা শুরু করার মূল উদ্দীপকও ছিলো অনলিঅফিসের সাম্প্রতিক ভার্সনে বাংলা সমর্থন যুক্ত হওয়া।

পূর্বের ভার্সনগুলোতে অনলিঅফিস বাংলা সমর্থন করত না। তবে অনলিঅফিস ৭.২ সংস্করণ থেকে এখানে ligature সমর্থন যুক্ত হয়েছে, ফলে এই ভার্সন থেকে অনলিঅফিস বাংলা ভাষা যথাযথভাবে প্রদর্শন করতে পারে। ইউনিকোড (অভ্র) ও আনসি (বিজয়) উভয় এনকোডিংয়ে বাংলা ভাষা এখানে ব্যবহার করা যাবে।

ফরমেটিং এবং কম্প্যাটিবিলিটি

অনলিঅফিস Microsoft OOXML ফরমেট ব্যবহার করে, যেটা মাইক্রোসফট অফিস ২০০৭ থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে। মাইক্রোসফট অফিসের মতই এখানে ডিফল্ট ফাইল ফর্মেটগুলো .docx, .xlsx এবং .pptx। মাইক্রোসফট অফিস কম্প্যাটিবিলিটি উঁচুমানের, বেশ চ্যালেঞ্জিং ক্ষেত্রেও সাধারণত যথাযথ ফরমেটিং ধরে রাখতে পারে- যেখানে লিব্রাঅফিস স্ট্রাগল করে।

বিপরীতে লিব্রাঅফিস, ওপেনঅফিস প্রভৃতিতে ব্যবহৃত ODF (.odt, .ods, .odp প্রভৃতি) ফরমেটের সাথে অনলিঅফিস ব্যবহারযোগ্য, তবে এডিটিংয়ের সময় মূলত তা OOXML-এ কনভার্ট করে অনলিঅফিস কাজ করে- অর্থাৎ ODF ফরমেটের সাথে কম্প্যাটিবিলিটি এখানে ন্যাটিভ নয়। সাধারণত চলনসই, তবে কিছু এদিকওদিক হতে পারে।

ইন্টারফেস

অনলিঅফিস ইন্টারফেস বেশ মডার্ন, মাইক্রোসফট অফিসের মত রিবন ইউআই ব্যবহার করে। যাইহোক, এর ইউআই মাইক্রোসফট অফিসের 1:1 ক্লোন নয়, তবে মাইক্রোসফট অফিস ইউজারদের খুব অপরিচিতও বোধ হবে না। কিছু জায়গায় সাইডবারের ব্যবহার আছে- যেমন প্যারাগ্রাফ, শেইপ বা টেক্সট আর্ট ফরমেটিং।

ডার্ক থিম ও ইন্টারফেস স্কেলিং ফিচার আছে।

মোবাইল ভার্সন

অনলিঅফিসের মোবাইল ভার্সনের ইন্টারফেস ডেস্কটপ ভার্সন থেকে বেশ ভিন্ন। ফিচারেও সীমাবদ্ধতা আছে। যেমন টেক্সট আর্ট, ইকুয়েশন এডিটর, প্রেজেন্টেশনে অবজেক্টভিত্তিক এনিমেশন, ওয়াটারমার্ক সহ অনেক ফিচার এখানে থাকছে না- যা ডেস্কটপ ভার্সনে রয়েছে।

ইন্টেরেস্টিংলি, স্মার্টফোন ব্রাউজার থেকে ওয়েব ভার্সনও মোবাইল ভার্সনের অনুরূপ ।

ফিচারসমূহ

মোবাইল ভার্সনের ব্যাপারটা তো বললাম। ডেস্কটপ ভার্সনের কথা বললে এখানে সচারচর প্রয়োজনীয় ফিচারগুলো মূলত সবই রয়েছে। তুলনামূলক এডভান্সড ফিচারগুলো দেখলে লিব্রাঅফিস বা মাইক্রোসফট অফিস থেকে পিছিয়ে থাকবে- তবে এখানে সে ফিচারগুলোর কথা বলছি যা রেগুলার ইউসেজে সাধারণত দরকার পড়ে না। এখানে আমি শুধু কয়েকটি ফিচার নিয়ে কথা বলবো, যেগুলো রেগুলার ইউজারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ইকুয়েশন এডিটর আছে। মাইক্রোসফট অফিসের মতই, তবে প্রতিবার ড্রপডাউন মেনু থেকে সিলেক্ট করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ। ভালো কথা হলো মাইক্রোসফট অফিসের অনুরূপ কীবোর্ড ইনপুটগুলো সমর্থন করে। টেক্সট আর্ট (ওয়ার্ড আর্ট) সমর্থন আছে।

ডকুমেন্ট এডিটরে ওয়াটারমার্ক ফিচার রয়েছে। তবে পেজ বর্ডার তৈরি করা সমর্থিত না, যদিও অন্য সফটওয়্যারে এডিটকৃত ফাইলে বর্ডার থাকলে তা প্রদর্শন করতে পারে। পেজ কালার সমর্থন নেই। পেজ নাম্বার সমর্থিত, প্রথম পেজের জন্য ভিন্ন হেডার ও ফুটার সমর্থিত।

স্প্রেডশিট আমি খুব কমই ব্যবহার করি- বিশেষ কিছু তাই বলতে পারছি না। তবে কিছু হিসাব-নিকাশের কাজ করার চেষ্টা করেছিলাম, এক্সেলের অনুরূপভাবে সূত্রগুলো কাজ করে- এক্সেলের টিউটোরিয়াল সরাসরি ফলো করা যায় অনেক ক্ষেত্রে।

প্রেজেন্টেশনের কথা বললে ট্রানজিশন ইফেক্ট ও অবজেক্ট এনিমেশন সমর্থিত, এবং তা আই-সুথিং স্মুথ। কাস্টম পথ এনিমেশনসহ মাইক্রোসফট অফিসের মত basic, subtle, moderate ও exciting এনিমেশন রয়েছে।

প্রেজেন্টেশন চলাকালীন অ্যানোটেশন ফিচার নেই। Animation Pane এর কোন যথাযথ অল্টারনেটিভ এখানে এখনো নেই, যেটা পর্যায়ক্রমিকভাবে এনিমেশনগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে যথেষ্ট অসুবিধাজনক। প্রেজেন্টেশন চলাকালে অ্যানোটেশন ফিচার নেই।

পিডিএফ রিডারটি পিডিএফ পড়া- মূলত এটুকুর জন্যই। অ্যানোটেশন, ফর্ম ফিলআপ, বুকমার্কের মত ফিচারগুলো এখানে থাকছে না। অন্য ডকুমেন্টকে পিডিএফ হিসেবে সেভ করা অনলিঅফিসে সমর্থিত।

একটা কথা বলে রাখা ভালো, ২০১০ সালে যাত্রা শুরু করা অনলিঅফিস অনেকটা পথ পাড়ি দিলেও প্রতিষ্ঠিত অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় তারা এখনো কিছুটা নবীন। সামনের রিলিজগুলোতে এখনকার সীমাবদ্ধতাগুলো পূরণ হবে- এমনটাই আশা করব।

প্লাগইনস

অনলিঅফিসের সাথে আরো ফাংশনালিটি যুক্ত করার জন্য প্লাগইনস সমর্থন আছে। কিছু ইউজফুল প্লাগইন রয়েছে এর মধ্যে। ফটো এডিটর, ট্রান্সলেটর, OCR এরকম কিছু প্লাগইনস প্রি-ইনক্লুডেড। আরো প্লাগইনস পাওয়ার জন্য রয়েছে প্লাগইন মার্কেটপ্লেস

অভিমত

অনলিঅফিসের ইউজার এক্সপ্রেরিয়েন্স চমৎকার, স্বচ্ছন্দ্যময়। মাইক্রোসফট অফিসের সাথে কম্প্যাটিবল, ইউজার ফ্রেন্ডলি এবং একইসাথে ফ্রি কোন অল্টারনেটিভ খুঁজলে অনলিঅফিস খুব সহজেই সাজেস্ট করা যায়। এমনকি আমি নিজে যদিও মূলত লিব্রাঅফিস ইউজার, সম্ভবত বেশিরভাগ মানুষের জন্য অনলিঅফিস-ই সিমপ্লি ইজিয়ার চয়েস বলে আমার মনে হয়েছে।

অনলিঅফিস ওয়েবসাইট

একটি নিয়নবাতি পরিবেশনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *