ছোটবেলায় ঢাকার দিকে যাওয়া হলে পথে ‘ভাসানী নভোথিয়েটারের’ অদ্ভুত গম্বুজ চোখে পড়ত। তারপর একদিন সেখানে যাওয়ার সুযোগ হলো। ২০০৯ সালের আশেপাশে। সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনড পুরো ভবন, গ্রহ-নক্ষত্রের আবহে সাজানো- নতুন ধরণের অভিজ্ঞতা বৈকি। সূর্যের চারপাশে পৃথিবী আর তার চারপাশে চাঁদের ঘোরার একটা সিমুলেশন, একটা বড় মাপের ‘খ-গোলক’ (গ্লোব), বিভিন্ন গ্রহের মডেল এরকম সব মিলিয়ে আবহটা শুরু থেকেই পরিষ্কার।
তারপর সেই রহস্যঘেরা গম্বুজের ভেতরে যাওয়ার সুযোগ হলো। আলো-আঁধারের মাঝামাঝি করিডোর দিয়ে ঢোকা- কেমন গা ছমছমে ভাব।
নভোথিয়েটারের গ্যালারির ঠিক মাঝখানের জাপানি Goto কোম্পানির GSS-Helios প্রজেক্টর। ওটাকে অন-একশন দেখা ব্যাপারটা মনে রাখার মতই বটে। আসলে এটা ঠিক সাধারণ প্রজেক্টর না, এটা একটা Starball। দৃষ্টিনন্দন ও সুনিপুণভাবে ২৫,০০০টা আলাদা আলাদা তারা রেন্ডার করতে পারে এই যন্ত্রটা, সাথে ওপরে-নিচে মুভ ও বিভিন্নদিকে রোটেট করতে পারে। তার সাথে ছিলো Astrovision 70 প্রজেক্টরের ব্যবহার।

তখন শো ছিলো ‘Journey to Infinity’। শো-এর বিষয়বস্তু খুব একটা তো মনে নেই। তবে আদিম মানুষদের আকাশ দেখা আর বিভিন্ন তারামন্ডল (Constellation) মেলানো এরকম একটা অংশ আবছা ছবির মত মনে হচ্ছে। তারপর বোধহয় সৌরজগতের গ্রহগুলো। তবে সবচেয়ে বেশি মনে থাকার মত বিগ ব্যাং বা সুপারনোভা বিস্ফোরণগুলো- আর এনিমেশনের অসাধারণ কারসাজি, যাতে মনে হয় পুরো গ্যালারি কখনো পর্দা থেকে দূরে সরছে, কখনো কাছে আসছে, কখনো মনে হবে গ্যালারিটা যেন ঘুরছে।
অনুবাদ কতটা সাবলীল- এগুলো সেই সময়ে তো খেয়ালে আসতো না। তবে ভরাট কন্ঠে চমৎকার উপস্থাপনা, বাংলা ভাষায় ঠিক যেমনটার সাথে আমরা স্বচ্ছন্দ্য। সাউন্ড সিস্টেমও অসাধারণ ইমার্সিভ আবহ এনে দেয়। এখানে একটা সাংস্কৃতিক দিক আছে। যেমন, বর্তমান শো-গুলোর ইংরেজি কিছু ডকুমেন্টরি বা ট্রেইলার দেখছিলাম, বাংলা ডাবিং আর মূল ইংরেজির উপস্থাপনা একেবারেই আলাদা।
অন্যদের দিক থেকে শুনছিলাম আগে আরো একটা শো দেখানো হত। ‘Whales’, ‘The Grand Canyon’, ‘Africa: The Serengeti’, ‘The Living Sea’ লার্জ ফর্মেট ফিল্মগুলো দেখানো হয়েছে আগের বছরগুলোতে। সম্ভবত বছরখানেকের মত সময়কালের জন্য লাইসেন্স করা হত এই শো-গুলো। কিন্তু আমাদের সময়ে কোনটাই দেখানো হয়নি।
নভোথিয়েটার অবশ্য শুধু প্লানেটারিয়াম না। ২০০৯ সালে প্রথম যাওয়ার সময়ে আর কী কী ছিলো মনে নেই, তবে রাইড সিমুলেটর ছিলো। ওতে সম্ভবত ভার্চুয়াল রিয়ালিটির মত রোলার কোস্টার সিমুলেশন উপভোগ করা যেত। এখন এক্সিবিটস গ্যালারি, 5D মুভি থিয়েটার, পরমাণু শক্তি তথ্য কেন্দ্র এমন আয়োজনগুলো আছে। তবে তখন এবং এখন পর্যন্ত প্লানেটারিয়াম বাদে এগুলো কোনটা এক্সপ্লোর করা হয়নি।
পরেরবার যাওয়া হয়েছিলো বোধহয় দু-তিন বছরের মধ্যে। তখন জার্নি টু ইনফিনিটির সাথে লার্জ ফর্মেট ফিল্ম দেখানো হচ্ছিলো ‘এই আমাদের বাংলাদেশ’। ছোটবেলা থেকে বারবার বাংলাদেশের যে চিত্রায়ন আমাদের পাঠ্যবইগুলো বা সব জায়গাতে দেখানো হয়েছে- বাংলাদেশের গ্রাম-শহর, মুক্তিযুদ্ধ এবং এরকম কিছু দিক ছিলো মনে হয়।
তবে দুর্বিষহ ছিলো তারপরের বারের অভিজ্ঞতা, আমার জন্য যেটা তৃতীয়বার। তখন বোধহয় ২০১৬ সালের দিকে। ভাসানি নভোথিয়েটার ততদিনে হয়ে গেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার (সম্ভবত দ্বিতীয়বার যখন গেছি তার আগেই)। এবং সরকারী গ্যাজেট অনুযায়ী, নভোথিয়েটারের নাম প্রতিষ্ঠা থেকেই বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার হিসেবে গণ্য হবে। মানে কাগজে-কলমে ভাসানি নভোথিয়েটার অস্তিত্বই কোনকালে ছিলোই না।

‘জার্নি টু ইনফিনিটি’ এর বদলে নতুন ৫টা শো এসেছে, দিনের ৫টা শোতে একেকটা দেখানো হয়। ‘Mission to the Black Holes’, ”Goodnight Goldilocks’, ‘Journey to the Stars’, ‘Dawn of the Space Age’, এবং ‘Symphony of the Starry Sky’। আমরা গেছিলাম দুপুরের দিকে, তখন সম্ভবত ‘Journey to the Stars’ শো ছিলো, খেয়াল নেই ঠিক।
সময় হলো। GSS-Helios নিচে নেমে গেলো। শো শুরু হলো। তবে ‘Journey to the Stars’ শুরু হলো না। শুরু হলো বঙ্গবন্ধু।
ওকে, খুবই ভালো, বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটারে এসেছি, বঙ্গবন্ধু একটু তো দেখতে হবেই। তারপর ৫ মিনিট গেলো। ১০ মিনিট গেলো। ১৫ মিনিট গেলো। বঙ্গবন্ধু শেষ হয়না। ৩০ মিনিট ধরে বঙ্গবন্ধু-ই চললো। বঙ্গবন্ধু বলতে বঙ্গবন্ধু- মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের ইতিহাস টাইপ কিছু না, পিওর বঙ্গবন্ধু। কারণ ডিজিটাল বাংলাদেশ আর নয়কো কোন কল্পনা, শেখ হাসিনার ভিশন ২১ অলীক কোন গল্প না।
অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলে 240p তে ভিডিও দেখলে বা কম্পিউটারের মনিটরে 360p তে দেখলে যে কোয়ালিটি, তার থেকে ভিডিওর অবস্থা আরো বেশি ছাড়া কম করুণ না এমন অবস্থা। And did I say, এই জিনিস দেখার জন্য ১০০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হয়েছে? বঙ্গবন্ধু দেখার মাঝে ইন্টারেস্টিং একটা জিনিস অবশ্য ছিলো, গাড়িতে করে যখন টুঙ্গিপাড়ার পথে যাচ্ছিলো, সেই ভিউটা ফার্স্ট পার্সন স্টাইলে। তবে সেই 240p কোয়ালিটিতে।
এরপর আমার ঘড়িতে পাক্কা ৩২ মিনিট পিওর টর্চার শেষে ফাইনালি ‘২৫ মিনিটে’-র ‘মূল’ শো শুরু হলো। কিন্তু কোথায় গেলো আগের সেই কোয়ালিটি? GSS-Helios, যেটাকে ঘিরে আমার বড় উৎসাহ ছিলো, ওটা নিচেই নেমে থাকলো। ওটার কোন ব্যবহার হলো না। সবচেয়ে বড় কথা, ভিডিওতে কনট্রাস্টের অভাব আর ব্লারিনেস ইমার্সনের সুযোগ একদমই দেয় না।
বলা বাহুল্য, এরপরের অনেক বছর আর নভোথিয়েটারমুখো হইনি। তবে এর মধ্যে রংপুরের ভিন্নজগৎ পার্কে যাওয়া হয়েছিলো ২০১৮-র শেষদিকে। বিশাল এরিয়া। পার্কের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন বিখ্যাত স্থাপনার মিনিয়েচার সংস্করণসহ কিছুটা এডুকেশনাল একটা থিম রাখা হয়েছে এখানে। এখানে একটা প্লানেটারিয়ামও আছে। ওতে ‘সৌরজগৎ’ নামে একটা শো প্রদর্শিত হচ্ছিলো। ১১ মিনিটের শো, যেখানে গ্রহের তালিকাতে প্লুটোও ছিলো। প্রযুক্তিগত দিক থেকে খুবই লিমিটেড, একটা সাধারণ দ্বিমাত্রিক মুভেবল প্রজেক্টর সম্ভবত ব্যবহার হচ্ছিলো, স্ক্রিনের একটা অংশে এট এ টাইম। তবে পুরো স্ক্রিনজুড়ে তারা বা বিস্ফোরণ বোঝাতে বিভিন্ন রংয়ের পরিবর্তন এর জন্য বোধহয় আলাদা সিস্টেম ছিলো। তবে ধারাবর্ণনা সম্ভবত একই ভয়েসে হতে পারে, এবং সেটাই আসলে এই শো-এর সবচেয়ে শক্তিশালী দিক।
যাইহোক, তারপর জুলাই অভ্যুত্থান হলো। হাসিনার পতন হলো। আর কিছু না হোক, সর্বত্র ন্যারেটিভ প্রোপাগন্ডা ছড়ানোর যে অসম্ভব পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ছিলো, তা থেকে কিছুটা হলেও নিস্তার আসলো। নভোথিয়েটারের নাম আরেকবার পরিবর্তন হয়ে হলো নভোথিয়েটার। আগে পরে কিছু নেই। শুধু নভোথিয়েটার। এবং সাথে অবশ্যই বঙ্গবন্ধুর ডকুমেন্টরি বাদ পড়লো। তার বদলে এখন দুটো করে শো প্রদর্শিত হয় প্রতি টিকিটে।
তবে শো আগেরগুলোই মূলত। ‘Journey to the Stars’ বর্তমানের ফ্ল্যাগশিপ শো, যেটা প্রত্যেক প্রদর্শনীতে দেখানো হয়। দ্বিতীয় শো হিসেবে দিনের ৫ স্লটে ‘Dawn of the Space Age’, ‘Mission to the Black Hole’, ‘Two Small Pieces of Glass’, ‘Good Night Goldilocks’ ও ‘The Sun, Our Living Star’।

যদি আগের তালিকার সাথে মিলিয়ে দেখেন, ‘Symphony of the Starry Sky’ বাদ পড়েছে, এবং ‘Two Small Pieces of Glass’ ও ‘The Sun, Our Living Star’ নতুন যোগ হয়েছে। মজার বিষয় হলো নতুন যোগ হওয়া শো দুটো একচুয়ালি ক্রিয়েটিভ কমনস লাইসেন্সের, যেগুলো 4K রেজ্যুলেশনে ESO উন্মুক্ত করে দিয়েছে-এখানে পেয়ে যাবেন।
তো সর্বশেষ, চতুর্থবারের মত গেলাম মাসখানেক আগে। দিনের শেষের স্লট, সন্ধ্যার পর। মিলিটারি মিউজিয়ামের পাশে নভোথিয়েটারটা নিষ্প্রাণ পড়ে আছে মনে হলো। একটু দূর থেকে অদৌ সচল আছে কিনা বোঝা কঠিন। ১০০ টাকা প্রদর্শনীর টিকিটের বাইরে আলাদা ৩০ টাকা প্রবেশ টিকিটও করতে হয় এখন, ১৩০ টাকা মোট। প্রদর্শনীতে লোকসমাগম অবশ্য মোটামুটি ছিলো। গ্যালারির অর্ধেক থেকে কিছু কম হবে। তবে কেমন নিষ্প্রভ একটা ভাব তার বাইরে। এয়ার কন্ডিশনটাও মনে হচ্ছে ঠিকঠাক কভার করতে পারছে না।
প্রথম শো ‘Journey to the Stars’, দ্বিতীয় শো ‘The Sun, Our Living Star’। আগেরবারের মতই বিশাল স্ক্রিনের সাথে রেজ্যুলেশনের অভাব বড্ড বেমানান দেখাচ্ছে। কিন্তু তার থেকে বেশি চোখে পড়ে ব্রাইটনেস ও কনট্রাস্টের ঘাটতি। তবে তার সাথে যদি মানিয়েও নেন, তাহলে আরো বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে গম্বুজের পর্দা। কারণ পর্দার গ্রিডলাইনগুলো সবসময় খুবই স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান থাকে। আপনি কোনভাবেই শো-তে ডুবে যেতে পারবেন না। এবং একইসাথে শেষ কবে পর্দাটাও দৃশ্যত অনেকদিন পরিষ্কার করা হয়নি ঠিকভাবে। মেইনটেইনেন্সের অভাবটা পুরো সময় অনুভব করবেন।

অথচ যে প্রদর্শনীগুলো দেখানো হচ্ছে, সেগুলোর এনিমেশন কিন্তু অত্যন্ত উঁচুমানের। এমনকি এই সবকিছুর পরও আপনার মাঝেমাঝে মনে হবেই গ্যালারিই মুভ করছে কিনা। বিস্ফোরণ কিংবা মুভমেন্টের দৃশ্যগুলোর এনিমেশন অবিশ্বাস্যরকম জীবন্ত। কিন্তু অপরিষ্কার পর্দা আর দৃশ্যমান গ্রিডলাইন আপনাকে সেখানে হারিয়ে যেতে দিবে না।
তবে সাউন্ড কোয়ালিটি প্রশংসাজনক জায়গাতে থাকবে। কিন্তু ডাবিং না। ‘Journey to the Stars’ এর অনুবাদ খুবই যান্ত্রিক। সাবলীলতা একদমই নেই। ‘The Sun, Our Living Star’ এটার ডাবিং অবশ্য লক্ষ্যণীয়ভাবে বেটার ছিলো। তবে পুরোপুরি সাবলীল না, অনুবাদের ভাবটা এখানেও স্পষ্ট।
আরেকটা লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো শো-গুলোর বিষয়বস্তু। নভোথিয়েটারে মানুষ কিন্তু প্রতিদিন নতুন নতুন বিষয় শিখতে যায়, এরকম না। বরং একটু ঘুরতে যাওয়া, তার মাঝে হয়ত মহাকাশ নিয়ে কিছু কৌতুহল তৈরি হওয়া এই তো। সেই দিক থেকে বর্তমানের শো গুলো কিছুটা বিশেষায়িত টপিকে- যেমন ব্লাক হোল, তারা, টেলিস্কোপ, মহাকাশ যাত্রা। তো এই ক্ষেত্রে প্রতিদিন ৫ সময়ে ৫ রকম শো যেভাবে নির্বাচন করা হয়েছে, তা অনেকটা যেন র্যান্ডম। সাপ্তাহিক দিন অনুযায়ী বিন্যাস বা আরো সুচিন্তিতভাবে সাজানোর সুযোগ ছিলো।
বিশেষ করে ‘Journey to the Stars’ আর ‘The Sun, Our Living Star’ এই দুটো এক প্রদর্শনীতে রাখা, এটা সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত হতে পারে না। Journey to the Stars তারাদের জন্ম-মৃত্যু প্রভৃতি নিয়ে, যেখানে বড় একটা সময় গেছে সূর্যকে ঘিরে, আর The Sun, Our Living Star সূর্যকে নিয়ে, যেখানে প্রাসঙ্গিকভাবেই এসেছে তারাদের কথা। প্রথমটা আমেরিকান, দ্বিতীয়টা ইউরোপিয়ান প্রোডাকশন, কিন্তু থিম খুবই কাছাকাছি। এবং আই থিঙ্ক কিছু সময় পর অনেকেরই বোরিং লাগবে, কারণ আমার নিজেরই লাগছিলো। (আর ডাবিং কোয়ালিটি নিয়ে তো বলেছিই)।
GSS-Helios এর কথাটা আলাদাভাবে বলছিলাম। আসলে প্রথম দেখাতে যে ফ্যাসিনেশন তৈরি হয়েছিলো ওটা এখনো থেকে গেছে। এখন বোধহয় কোন শো-তেই এটা আর ব্যবহার হয় না। যেমনটা বলছিলাম কোন ডিজিটাল প্রজেক্টর না- এটা একটা স্টারবল, একটা মেকানিকাল যন্ত্র। এখানে প্রত্যেকটা তারা আলাদা আলাদা রেন্ডার হয়, মুভমেন্টের সময় মেশিন ফিজিকালি রোটেট করে। যেকারণে শুধুমাত্র স্পেসিফিকভাবে এই যন্ত্রের জন্য বিশেষায়িত শো-এর জন্যই এটা কার্যকর।
অন্যদিকে ডিজিটাল প্রোজেক্টরে আপনি তারা বা যেকোন কিছু দেখাতে পারবেন। কিন্তু আমার বিশ্বাস, এটা শুধু নস্টালজিয়া না, বাস্তবিকই অপটো-মেকানিকাল স্টারবলের তারাগুলোর যে বিমোহনী ক্ষমতা ছিলো, ডিজিটাল ফরমেট তার আশেপাশে নেই, খুবই ব্লেন্ডেড। কারণ নভোথিয়েটারের বড় পর্দার জন্য 4K রেজ্যুলেশনও খুব বেশি না। ডিজিটাল যুগ যখন অনেক কিছুকে সহজ করে নিয়েছে, তার সাথে আমরা হারিয়েছিও অনেক কিছু।
ব্যক্তিগতভাবে ডিজিটালাইজেশন নিয়ে আমার একটু অনীহা কাজ করে। যদি মেকানিকাল আর ডিজিটালের তর্ক হয়, তাহলে হয়ত আমার মন্তব্য পক্ষপাতমুক্ত হবে না। তবে তার বাইরে সাধারণভাবে ডিজিটাল মাধ্যমে উঁচুমানের প্রোডাকশন অবশ্যই সম্ভব। বিশ্বের সামনের সারির অনেক প্লানেটারিয়াম বর্তমানে পুরোপুরি ডিজিটালের দিকে মুভ করছে। কিন্তু সেটা করলেও প্রোপারলি করতে হবে।
ঢাকা নভোথিয়েটারে এই পরিবর্তনটা খুব প্রোপারলি করা হয়নি, এটা বলাই যায়। সেটা হার্ডওয়্যারের সীমাবদ্ধতার জন্য হোক, বা দক্ষ জনবল ও কোয়ালিটি-কন্ট্রোলের অভাবের জন্য- যেকারণেই হোক। এখন প্রজেকশন কোথা থেকে হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করছিলাম। সামনে-পেছনে দুদিকে পর্দা সংলগ্ন দুটো ফুটবলের থেকে ছোট গোলকের মত প্রজেক্টর কাজ করছিলো সম্ভবত। এর বাইরে আর কিছু চোখে পড়লো না।
আর আমি জানি না, ঢাকা নভোথিয়েটারের GSS Helios বর্তমানে কর্মক্ষম বা সাপোর্টেড আছে কিনা, যেহেতু প্রায় তিন দশক হয়ে গেছে বয়স। তবে যদি সম্ভব হয়, অন্তত সাপ্তাহিক নির্ধারিত এক-দুইটা শোতে এটার ব্যবহার আমি অবশ্যই দেখতে চাইবো।
নভোথিয়েটারের কাজের শুরু আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ শাসনামলে। ২০০৪ সালে যখন এটা প্রতিষ্ঠা হয়, সেই সময়ে বাংলাদেশে এরকম একটা কিছু থাকা- এটা অসাধারণ থেকে কম কিছু ছিলো না। ২১ মিটারের সুপ্রশস্ত গম্বুজ, জাপানিজ Goto কোম্পানির তখনকার সময়ের টপনচ সেটআপ এবং সর্বোপরি মহাকাশ নিয়ে আগ্রহী করে তোলার একটা চমৎকার আয়োজন।
কিন্তু সময়ের সাথে নভোথিয়েটার সেই জায়গা থেকে অনেক দূর সরে এসেছে। বিশেষ করে ২০০৯-২০২৪ আর সবকিছুর মতই আওয়ামী লীগের মুজিবীয়করণ ও ন্যারেটিভ প্রচারের অস্ত্রের থেকে আলাদা কিছু হয়ে কাজ করেনি নভোথিয়েটার। শেখ হাসিনার পতনের পর সেই অংশটুকু বাদ পড়লেও বাদবাকি অব্যবস্থাপনার দৃশ্য বদলায়নি।
এর কারণ খুঁজতে গেলে বোধহয় সেই জায়গাতেই যেয়ে মিলবে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব খাতের সকরুণ দশা যেকারণে। নভোথিয়েটার নিয়ে স্পেসিফিক যদিও আমি জানি না, বাংলাদেশের সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলো কীভাবে হয় আমরা কমবেশি জানি। আপনি এখানে চাকরির পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশের মুদ্রা আর রাজধানীর নাম মুখস্থ করবেন, যদিও আপনি সেসব দেশের সংস্কৃতি, রাজনীতি কিংবা ইতিহাস নিয়ে জানবেন না। আপনি লেখক-কবি-সাহিত্যিকদের জন্ম-মৃত্যুর দিনক্ষণ মুখস্থ করবেন, যদিও তাদের সাহিত্যকর্ম আপনি পড়বেন না। আর যদি আপনাকে যদি ওপরের দিকে যেতে হয়, তবে এগুলোর কোনটাই লাগবে না, আপনাকে শুধু ওপরমহলের চাটুকার হয়ে থাকতে হবে।
ক্ষমতার পালাবদলের পরও আমরা ইতোমধ্যে রাজনৈতিক বহিষ্কার ও নিয়োগের কিছু ধারা দেখতে শুরু করেছি। এই ধারার পরিবর্তন হোক। শিক্ষা সত্যিকারার্থে শিক্ষিত সমাজ তৈরির জন্য হোক, নিয়োগ প্রক্রিয়া যোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচনের মত করে হোক। পরিশেষে, প্রত্যাশা করি শেখ হাসিনা সরকার যেমন প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে অপব্যবহার করেছে, তারেক রহমানের সরকার তার পুনরাবৃত্তি না করুক।
সবকিছুর ভিড়ে, নভোথিয়েটার একটা ভিন্ন ধরণের অভিজ্ঞতা। মেট্রোরেলে বিজয় সরণি নামলে সেখান থেকে একটু হাঁটলেই নভোথিয়েটার। যেহেতু এখন অন্তত অন্য কারো বাপের জীবনী প্রদর্শনী চলছে না, সুযোগ থাকলে আমি বলবো নভোথিয়েটারে একবার ঘুরে আসা উচিৎ। এখনকার মতই থাকলে কিছুটা হতাশ হতে হবে সত্য, তবে তার মাঝেও হয়ত কিছু জিনিসের জন্য আবার আসতে ইচ্ছা হবে।
ঢাকা নভোথিয়েটারের বাইরে অন্য বিভাগীয় শহরগুলোতে নভোথিয়েটার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো। রংপুর, বরিশাল ও খুলনা নভোথিয়েটারের কাজ সম্ভবত চলমান আছে। রাজশাহীতে ১৩০ আসন ও ১৫ মিটার গম্বুজবিশিষ্ট নভোথিয়েটারের স্থাপন কাজ শেষ হয়েছে। ওখানে ভিন্ন ৬টা শো দেখানো হয়- Cosmic Adventure, Robot Explorers, Ice Worlds, Edge of Darkness, Magnetism এবং Secret Lives of Stars। সুযোগ হলে দেখে আসার ইচ্ছা আছে।
এই লেখার একটা বড় অংশ স্মৃতি থেকে লেখা। বলবো না আমার স্মৃতিশক্তি খুব ভালো। একটু কমবেশি থাকতে পারে। বাংলাদেশের সরকারি ওয়েবসাইটগুলোতে তথ্য খোঁজার অভিজ্ঞতা কেমন হতে পারে, এটা আলাদাভাবে বলার প্রয়োজন নেই। কাজের তথ্যের থেকে এখনো হাসিনা বন্দনাতেই পূর্ণ থেকে গেছে। লেখার বিভিন্ন তথ্য ও টেকনিকাল দিকগুলোর জন্য অনলাইনের বিভিন্ন চিপাগলি ঘুরতে হয়েছে।

বহিঃসংযোগ:
আবার, বারবার নভোথিয়েটার – নিশাচর ব্লগ – নভেম্বর ৮, ২০১৪
Goto – Hybrid Planetarium
FULLDOME DATABASE
Worldwide Planetariums Database
Video Archive: Fulldome – ESO
Bhasani Novotheatre of Dhaka – Media Bangladesh
নভোথিয়েটার – বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন
রাজশাহী নভোথিয়েটার – বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন
থাম্বনেইল – Shariful Islam (Masum) – Wikimedia Commons




