রিজনিং হলো যুক্তি ও কার্যকারণ থেকে সিদ্ধান্তে আসা। আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে রিজনিং করি। যেমন পরীক্ষার পরে কারো মন খারাপ দেখে তুমি বুঝলে তার পরীক্ষা ভালো হয়নি। এটা একরকম রিজনিং। বৈজ্ঞানিক গবেষণাতে পর্যবেক্ষণ থেকে আমরা বিভিন্ন উপাত্ত সংগ্রহ করি। এই উপাত্তগুলো থেকে যখন একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়, তখন আমাদের রিজনিং করতে হয়।

রিজনিংয়ের প্রকারভেদ

Deductive Reasoning

যদি আমাদের একাধিক সত্য জানা থাকে, তাহলে তার আলোকে যদি নতুন একটা সত্য অবধারিত হয়ে যায়- তাহলে সেটা উদঘাটন করা হবে ডিডাক্টিভ রিজনিং।

ডিডাক্টিভ রিজনিংয়ের খুব জনপ্রিয় একটা উদাহরণ হলো,

প্রস্তাবনা ১: মানুষ মাত্রই মরণশীল
প্রস্তাবনা ২: সক্রেটিস একজন মানুষ
সিদ্ধান্ত: সক্রেটিস মরণশীল

প্রস্তাবনা ১ এখানে একটা সাধারণ সত্য উপস্থাপন করছে। প্রস্তাবনা ২ এ যখন আমরা সেটা প্রয়োগ করছি, তখন আমরা একটা নতুন তথ্য উদঘাটন করতে পারছি। অর্থাৎ এখানে আমরা একটা সাধারণ সত্য বা প্রস্তাবনাকে সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে সিদ্ধান্তে আসছি।

অন্য ধরণের রিজনিংগুলো থেকে ডিডাকটিভ রিজনিংয়ের বিশেষত্ব হলো যদি আমাদের প্রস্তাবনাগুলো সঠিক থাকে, তাহলে ডিডাক্টিভ রিজনিং সবসময়ই আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত দিবে।

তবে প্রস্তাবনাতেই ভুল থাকলে আমাদের সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে। যেমন,
প্রস্তাবনা ১: পাখিরা উড়তে পারে
প্রস্তাবনা ২: পেঙ্গুইন একটা পাখি
সিদ্ধান্ত: পেঙ্গুইন উড়তে পারে

এখানে প্রস্তাবনা ১ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সত্য হলেও পুরোপুরি সত্য না। যেকারণে এই প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে নেয়া ডিডাক্টিভ রিজনিং একটা ভুল উপসংহারের দিকে নিয়ে গেছে।

Inductive Reasoning

আমরা যদি ডিডাক্টিভ রিজনিংয়ের ঠিক উল্টোটা চিন্তা করি- অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট বিভিন্ন তথ্যকে একত্র করে সাধারণ সত্য আকারে নিয়ে আসার চেষ্টা করি, তাহলে তা হবে ইনডাক্টিভ রিজনিং।

ইনডাক্টিভ রিজনিং হলো আমাদের জ্ঞানকে জেনারেলাইজ করা। ডিডাক্টিভ রিজনিংয়ে আমরা সাধারণ কোন সত্যকে সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রয়োগ করি। ইনডাক্টিভ রিজনিংয়ে আমরা সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণগুলো থেকে আরো বিস্তৃতভাবে প্রয়োগ করার মত সাধারণ একটা সত্য পর্যন্ত আসার চেষ্টা করি।

যেমন-

প্রস্তাবনা: এ পর্যন্ত প্রতিদিন সূর্য পূর্বদিকে উঠেছে
সিদ্ধান্ত: পরবর্তীতেও সূর্য পূর্বদিকে উঠবে

প্রস্তাবনা: আমি এ পর্যন্ত যত গোলাপ দেখেছি সেগুলো লাল রঙের ছিলো
সিদ্ধান্ত: সব গোলাপ লাল রংয়ের

এখানে দ্বিতীয় উদাহরণের প্রস্তাবনা সত্য হতে পারে- অর্থাৎ একজন পর্যবেক্ষকের দেখা সব গোলাপ লাল হতে পারে। কিন্তু তা নিশ্চিত করে না যে সব গোলাপ-ই লাল হবে। অর্থাৎ, ইন্ডাক্টিভ রিজনিং ডিডাক্টিভ রিজনিংয়ের মত সুনিশ্চিত সত্য দেয় না। তবে আমরা যত বেশি পর্যবেক্ষণ করব, তত বেশি সঠিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হতে পারবো। যেমন, পূর্বের উদাহরণের পর্যবেক্ষক পরবর্তীতে হলুদ রংয়ের একটা গোলাপ দেখতে পেলো। তাহলে এখন সে সংশোধন আনতে পারে,

প্রস্তাবনা: আমার দেখা গোলাপগুলোর একটা হলুদ রঙের ও বাকিগুলো লাল রঙের ছিলো
সিদ্ধান্ত: অধিকাংশ গোলাপ লাল রঙের হয়, তবে কিছু কিছু অন্য রংয়ের

বিজ্ঞানের বেলায় এটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আরো বেশি পর্যবেক্ষণের সাথে আমাদের পূর্বের রিজনিং ভুল প্রমাণ হতে পারে বা সংশোধন প্রয়োজন হতে পারে। ইন্ডাক্টিভ রিজনিংয়ের এই দিকটিকে বলা হয় Black Swan Problem বা কালো রাজহাঁসের সমস্যা। একজন যদি সবসময় সাদা রঙের হাঁস দেখে আসে, সে মনে করবে সব হাঁসের রং-ই সাদা। কিন্তু কোন একদিন জাস্ট একটা কালো রংয়ের হাঁস খুঁজে পেলেই তার এই ধারণা ভুল প্রমাণ হবে।

সত্যি বলতে আমরা যে সবকিছু জানি না, এবং আমাদের সাধারণ দেখার বাইরেও যে আরো সত্য থাকতে পারে যা হয়ত যথেষ্ট পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করলে আমরা জানতে পারবো- এই ব্যাপারটাই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মূল অনুপ্রেরণা।

এটা ইন্ডাক্টিভ রিজনিংয়ের একটা সুন্দর দিক- যে ইন্ডাক্টিভ রিজনিংয়ে ভুল থাকলে পর্যবেক্ষণের সাথে তা অনেক সময় ধরতে পারা সম্ভব, আবার প্রয়োজনে পরিমার্জন বা সংশোধন আনা সম্ভব। আবার কোন কোন সময় একটা ইন্ডাক্টিভ রিজনিং থেকে নেয়া সিদ্ধান্ত পুরোপুরি সঠিক না হলেও অনেক জায়গাতেই প্রয়োগ করার মত যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য হয়।

Analogical Reasoning

অ্যানালজিকাল রিজনিং হলো উপমা বা সাদৃশ্যতার ভিত্তিতে রিজনিং। এটা আসলে ইনডাক্টিভ রিজনিংয়ের আরো দুর্বল একটি রূপ। ইনডাক্টিভ রিজনিংয়ে আমরা একাধিক পর্যবেক্ষণ থেকে সাধারণ রূপ দিই, অ্যানালজিতে একটা পর্যবেক্ষণকে অন্য ক্ষেত্রে প্রয়োগ করি।

যেমন, বাংলাদেশের একটা দুঃখজনক বাস্তবতায় অনেককে হয়ত শুনতে হয়, ও পারলে তুমি পারবে না কেন, বা ওর হলো তোমার হলো না কেন প্রভৃতি। তো এগুলো অ্যানালজিকাল রিজনিংয়ের মধ্যে পড়ে,

প্রস্তাবনা: ও পেরেছে
সিদ্ধান্ত: তোমারও পারার কথা

অথবা আরো উদাহরণ দেয়া যায়,

প্রস্তাবনা: রাহাত আপেল পছন্দ করে
সিদ্ধান্ত: রাহাতের ভাই আপেল পছন্দ করবে

Abductive Reasoning

এবডাক্টিভ রিজনিং হলো ইনডাক্টিভ বা ডিডাক্টিভ রিজনিংয়ের মধ্যে পড়ে না এমনভাবে কোন ঘটনার সবচেয়ে সম্ভাব্য কারণ বা ব্যাখ্যা খুঁজে বের করা। এর একটা উদাহরণ আমরা একদম শুরুতে দিয়েছি, যে পরীক্ষার পর কারো চেহারা মলিন হলে তার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে তার পরীক্ষা ভালো হয়নি। একজন ডাক্তার যখন রোগ নির্ণয় করেন, অনেক ক্ষেত্রে তাকে লক্ষণগুলো থেকে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বা আমরা যখন গবেষণায় হাইপোথিসিস দাঁড় করানোর চেষ্টা করি, এবডাক্টিভ রিজনিংয়ের প্রয়োজন হয়।

Fallacious reasoning

ফ্যালাসি বা ফ্যালাসিয়াস রিজনিং হলো এমনভাবে যুক্তি দেয়া, যেটা আসলে অযৌক্তিক বা ভ্রান্ত। এটার অনেক প্রকারভেদ আছে। যেমন-

False analogy: এমন একটা উপমা দেয়া যেটা অযৌক্তিক। আমরা ইতোমধ্যে উদাহরণ দেখেছি।

Straw man fallacy: প্রতিপক্ষের কথাকে পরিবর্তন করে এমন কথার খন্ডন করা, যেটা আসলে বলাই হয়নি। ধরা যাক, একজন বললো স্কুলের টিফিনে ভাজাপোড়া কম দেয়া উচিৎ, আর জবাবে বলা হলো বাচ্চারা তাহলে না খেয়ে মারবে নাকি।

False dilemma: এমন একটা দোটানা দেখানো যেখানে আসলে কোন দোটানা নেই। যেমন: হয় তোমার ক্রিকেট পছন্দ, নাহলে খেলাধুলাই পছন্দ না।

Circular reasoning: ঘুরেফিরে একই জায়গাতে আসা- সিদ্ধান্তকে সত্য ধরে তার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। যেমন- লোকটা অপরাধী, তাই সে অপরাধ করেছে। আর সে যেহেতু অপরাধ করেছে, তাই সে অবশ্যই অপরাধী।

এরকম বিভিন্ন লজিকাল ফ্যালাসি আছে।

Unreasonable decisions

এবং সবকিছুর পরে কখনো কখনো মানুষ এমন সব কাজ করে বা এমনসব সিদ্ধান্ত নেয়, যেখানে যুক্তির কোনরকম জায়গাই আসলে থাকে না।

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় রিজনিং

ডিডাক্টিভ রিজনিং আমাদের কাজে লাগে গণিত, যুক্তিবিদ্যা, মেশিন লার্নিং প্রভৃতি ক্ষেত্রে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আমাদের অনেক সময়ই ইনডাক্টিভ রিজনিংয়ের দিকে যেতে হয়। অর্থাৎ পর্যবেক্ষণের আলোকে সিদ্ধান্ত নিই। কাজেই যথেষ্ট পরিমাণ পর্যবেক্ষণ ছাড়া এবং সচেতন রিজনিং ছাড়া সঠিক সিদ্ধান্তের দিকে যাওয়া অসম্ভব হয়ে ওঠে।

যেমন ধরা যাক, মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে চালকবিহীন স্বয়ংক্রিয় গাড়ি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রথমবার পরীক্ষামূলকভাবে চালানোর সময় গাড়িটা কোন দুর্ঘটনা ঘটালো না। তাহলে গাড়িটাকে কি এখন নিরাপদ বলা যাবে? ব্যস্ত রাস্তায় সরাসরি নামিয়ে দেয়া যাবে? অবশ্যই না। আমাদের আরো ভিন্ন ভিন্ন নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে গাড়িটা চালিয়ে দেখতে হবে এবং যথেষ্ট সময় নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল সেটা রাস্তায় নামানোর প্রশ্ন আসবে। তারপরও দিনশেষে যতই গবেষণা চালানো হোক যন্ত্রের (এবং মানুষেরও) একেবারে শতভাগ নিশ্চয়তা দেয়া কিন্তু সম্ভব না!

আবার ধরা যাক, এখনকার সময়ে স্ক্রিনের ব্যবহার বেড়েছে। সবাই সারাদিন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। এবং দেখা যাচ্ছে চোখের বিভিন্ন সমস্যা বা চশমার ব্যবহারও বেড়েছে। আমরা দ্রুত একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারি, স্ক্রিন থেকে যে নীল আলো নির্গত হয় যেটা আমাদের চোখের ক্ষতি করে।

কিন্তু এটাই কিন্তু সঠিক কারণ না-ও হতে পারে। আরেকটা সম্ভাব্য কারণ হতে পারে সবসময় কাছের জিনিসের দিকে তাকিয়ে থাকা, দূরের জিনিসের দিকে তাকানোর অভ্যাস ছেড়ে দেয়া। তবে কিছু কিছু গবেষণা অন্য একটা সম্ভাবনা বলছে। বর্তমান সময়ে চশমার ব্যবহার বেশি হওয়ার মূল কারণ হলো সবসময় ঘর, স্কুল প্রভৃতির মধ্যে থাকাতে বাইরের পরিবেশ, আলোর সংস্পর্শ কমে যাওয়াতে চোখের বিকাশ বাঁধাগ্রস্থ হওয়া।

এই যে চোখে চশমার ব্যবহার বাড়ছে, এটা সমাধান করতে এটার কারণটাও কিন্তু সঠিকভাবে বের করা দরকার। আমাদের পর্যবেক্ষণের সাথে ওপরের তিনটা ব্যাখ্যাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু সঠিক কোনটা জানতে হলে আমাদের সচেতনভাবে যথেষ্ট পরিমাণ পরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ও রিজনিং করতে হবে।

একটা সিদ্ধান্ত কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নির্ভর করছে কোন রিজনিংয়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তটা এসেছে তার ওপর। যেমন- ডিডাক্টিভ রিজনিং থেকে কোন সিদ্ধান্ত আসলে, সেখানে সিদ্ধান্তের নির্ভরযোগ্যতা নির্ভর করেরবে সিদ্ধান্তের পেছনের প্রস্তাবনাগুলোর ওপর। ইন্ডাক্টিভ রিজনিংয়ের বেলায় যথেষ্ট পরিমাণে পর্যবেক্ষণ আছে কিনা, পর্যবেক্ষণে কোন ব্যতিক্রম ধরা পড়েছে কিনা- এরকম বিষয়গুলোর ওপর সিদ্ধান্তের নিশ্চয়তা নির্ভর করে। আর হ্যা, কখনো কখনো কোন কোন কথা খুব জোর দিয়ে বলা হয়, অথচ হয়ত সেগুলো দাঁড়িয়ে থাকে নিছক কিছু ফ্যালাসির ওপর।

একটি পরাবৃত্ত পরিবেশনা

পরাবৃত্ত আমাদের শিক্ষা বিষয়ক একটি প্লাটফর্ম এবং একাডেমিক কোচিং কার্যক্রম। আমরা পড়াশোনার সংস্কৃতিতে একটা পরিবর্তন আনার স্বপ্ন দেখি। যেখানে উদ্দেশ্য থাকবে সত্যিকারার্থে শেখা আর নিজেকে গড়ে তোলার, প্রত্যয় থাকবে ভালো কিছু করার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *