আসসালামু আলাইকুম।
সপ্তাহে গড়ে একটা করে বই পড়লে বছরে ৫২ টা। ৬০ বছর ধরে এভাবে পড়ে গেলেও ৩ হাজারের কিছু বেশি বই পড়া হবে। আর মাসে একটা করে বই পড়লে জীবনে হয়ত সাতশো-আটশো বই শেষ করার আগেই জীবন তার সমাপ্তিতে পৌঁছে যাবে।
অথচ একটা সময় ছিলো যখন জীবনটা সহজ ছিলো। এত অঙ্কের হিসাব মস্তিষ্ককে ভার করে রাখতো না। সামনের দিকে তাকালে দেখতাম দীর্ঘ পথে পড়ে আছে। বই পড়া হত ওই সময়টাতে। ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি ঘন্টাখানেক দাঁড়াতো। কোন কোন দিন ওই সময়েই ওয়াল্ট ডিজনির ছবি আঁকা বইগুলো দু-তিনটা শেষ করে ফেলতাম, তারপর আরেকটা বই নিয়ে যেতাম।
তারপর কখন যেন সময় এত দ্রুত যাওয়া শুরু করলো, তার সাথে আর তাল মেলাতে পারছি না। ঘড়ির কাঁটার টিক টক টিক টক প্রতি মুহুর্তে যেন কানে শুনি।
সময়ের সাথে বই পড়ার অভ্যাসটা একেবারেই গেছে। স্ক্রিন, ইন্টারনেট এত রংচংয়ের মাঝে বই পড়ার সময় কই? আর কেন যেন কোন সময়ই আর ‘অবসর’ মনে হয় না। কী এক অদ্ভুত ক্লান্তি নিয়ে স্ক্রল করে যাওয়া কিংবা শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা। অদ্ভুত জীবন।
তবে বই পড়া আর বই কেনা এই দুটো আবার আলাদা শখ। বই কেনা জিনিসটার মধ্যে আলাদা একটা মজা আছে। টাকা-পয়সা খরচের জায়গাতে নিয়ন্ত্রণ কম- অন্তত বিনা আয়ের মানুষ হিসেবে। তার জন্য ভুগতেও হয় অবশ্যি।
তো যাইহোক, শেল্ফে অনেক বেশি না হলেও বেশ কয়েকটা বই জমা হয়েছে ‘কোন একদিন’ পড়ার আশায়। মাঝেমাঝে দু-চার পেজ পড়ার চেষ্টা করছি এর মধ্যে। তবে যে গতিতে আর যে অনিয়মিত পড়ছি, তাতে মধ্যম একেকটা বই শেষ হতে ক্যালেন্ডারে কতগুলো মাস বদলায় হিসেবে থাকে না।
The Alchemist এমনই তিন-চার মাস বা হয়ত আরো বেশি লাগিয়ে শেষ করা। তবে এর পুরো দোষ আমি নিজে নিব না। বইটা সত্যি বলতে একটানা পড়ে যাওয়ার মত ড্রাইভ কখনোই তৈরি করতে পারেনি। বইটার যে জনপ্রিয়তা, আমার মনে হয়নি এটা তার প্রতি সুবিচার করছে।
সাধারণত কোন কিছু ভালো লাগলে আমি তার স্পয়লার দেয়া থেকে খুব সতর্ক থাকি। The Alchemist সেই তালিকাতে থাকবে না। যেকারণে সামনে কিছু মৃদু স্পয়লার থাকবে। অবশ্য গল্পের শুরুর আগেই Author’s Note-এ এর থেকে বেশি স্পয়লার দেয়া আছে, কাজেই যায় আসে না।
The Alchemist
The Alchemist নিজের গন্তব্য বা destiny-কে খুঁজে পাওয়ার একটা গল্প। নিজের স্বপ্নকে ছোঁয়ার সাহস করার অনুপ্রেরণা দেয়া গল্পের থিম। আমার আসলে ধারণা ছিলো The Alchemist বোধহয় নন-ফিকশন ধরণের হবে। তবে না, বইটা পুরোপুরি ফিকশনের ভঙ্গিতেই লেখা।
তবে ভালো ফিকশনগুলো একটা নীতি সাধারণত অনুসরণ করে- show, don’t tell। অর্থাৎ অনেক বেশি বর্ণনা বা ব্যাখ্যায় না যেয়ে চরিত্রায়ন, ঘটনা, গল্পশৈলী এসবের মধ্য দিয়ে পাঠককে নিজের মত করে গল্পের বার্তাগুলো বুঝে নিতে দেয়া। কিন্তু The Alchemist পাঠককে খুব বেশি অবকাশ দেয়নি এই ক্ষেত্রে। বরং লেখক নিজের ভাবনাগুলোই পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করেছেন।
তাতে আরেকটা সমস্যা হলো লেখকের নিজের চিন্তাগুলো বেশ কনভিনিয়েন্ট আসলে। যে মহাবিশ্বের ভাষা বোঝার চেষ্টা করে, আর ভয় না পেয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে- তার লক্ষ্য অব্দি পথ করে দিতে নানাভাবে মহাবিশ্বের নানাভাবে সাহায্য করবে। সে সাহায্য হয়ত কোন সংকেত বা প্রজ্ঞা বা হিতাকাঙ্ক্ষী কোন বন্ধুর রূপে। তবে বাস্তবতা যেহেতু সবার জন্য সমান হয় না, তাই এখান থেকে বাস্তব অনুপ্রেরণা নেয়া সমস্যাজনক বা কখনো অসম্ভব পর্যায়ের হয়ে যায়।
এরকম প্রত্যেকের নিজের একটা ট্রেজার (প্রতীকি অর্থে) আছে, যার অনুসন্ধান করতে দৃঢ় হলে মহাবিশ্ব বিভিন্নভাবে সে পথকে সুগম করতে ষড়যন্ত্র করে, তবে একইসাথে কঠিন থেকে আরো কঠিন বাঁধা সামনে আসবে, মহাবিশ্বের সার্বজনীন একটা ভাষা আছে এরকম কিছু ধারণার সত্যতার ওপর গল্পটা দাঁড়িয়ে। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে এই ধারণাগুলো দ্রুতই ভেঙে পড়ে।
অর্থাৎ চেষ্টা করে যাওয়ার প্রেরণা দেয়া এটাই গল্পের মূল বিষয় না, বরং চেষ্টা করতে থাকলে কী কী হবে, লেখকের তা নিয়ে একটা ভাবনা আছে এবং সেই ভাবনাটাই লেখক গল্পে উঠে এসেছে। সংলাপ, বা দীর্ঘ মনোলোগ প্রভৃতির মধ্য দিয়ে সেটা বারবার ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যে কারণে পাঠকের নিজের মত আলাদা কোন উপসংহারে পৌঁছানোর স্কোপও খুব একটা নেই। যে বিষয়গুলো গল্পটাকে সার্বজনীন হয়ে উঠতে দেয়নি।
তবে একটা বিষয় এখানে লক্ষ্যণীয় ছিলো, পাশ্চাত্য কাজগুলোতে আমরা সাধারণত সৃষ্টিকর্তা বা ধর্মবিহীন একটা প্রেক্ষাপট দেখি। মিথোলজিকাল বা উৎসব ধরণের কিছু বিষয় বাদে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ধর্মের যে প্রভাব সেগুলোকেও সতর্কভাবে পরিহার করা হয়। যেমন- Oh my God থেকে Oh my Gosh এ রূপান্তর করা। এমনকি স্পিরিচুয়ালিটি বিষয়ক থিম থাকলেও সাধারণত তা ধর্মবিহীন।
অন্যদিকে লাতিন আমেরিকান দেশ ব্রাজিলিয়ান লেখক পাওলো কোয়েলহোর The Alchemist-এ সৃষ্টিকর্তা ও ধর্মের ধারণা গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যেমন যাত্রার পথকে সুগম করতে মহাবিশ্বের ষড়যন্ত্র করা, বা ভালো-খারাপ লক্ষণ প্রভৃতি বিষয়গুলো এখানে সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতার প্রকাশ হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। এবং এটা ফুটনোট না, গল্পে মৌলিকভাবে প্রয়োজনীয় একটা দিক। গল্পের মূল চরিত্র খ্রিস্টান এবং বেশিরভাগ অংশ মুসলিম সমাজে সংগঠিত হয়েছে।
তবে অন্যান্য বিষয়গুলোর মতই এই জায়গাগুলোতেও লেখক মূলত নিজের চিন্তাধারা তুলে ধরার অবকাশ নিয়েছেন। খেয়াল করে পড়লে পাঠকেরা তা ধরতে পারবেন, যেমন- খারাপ যা খাওয়া হয় তার মধ্যে নেই, বরং যা বলা হয় তার মধ্যে। একইভাবে মহাবিশ্বের ষড়যন্ত্রের যে ধারণা তা লেখকের নিজের বলেই মনে করা যায়।
লেখনশৈলীর কথা বললে গল্পটা সাবলীল ভাষায় লেখা, সহজপাঠ্য। ইংরেজি গল্প পড়তে খুব বেশি অভ্যস্থ না হলেও অসুবিধে হয়নি। গল্পের ধীরগতি ও বর্ণনাভঙ্গী শুরুরদিকে বেশ ভালো একটা টোন সেট করে। তবে তাতে কোন তারতম্য বা ওঠানামা না আসাতে ক্রমশ সেটা একঘেয়ে একটা রূপ নেয়। এমনকি একটা পুরো যুদ্ধ হয়ে শয়ে শয়ে লোক মারা পড়ছে, এরকম একটা দৃশ্যে এসেও সেটা খুব একটা স্পর্শ করতে পারে না। শেষে চার-পাঁচ পেজ বাকি- তখনো হয়ত শেষটুকু কী হলো জানার আলাদা কোন তাগিদ বোধ করছি না, এরকম।
গল্পের মূল চরিত্র সান্তিয়াগোর চলার পথে শুরুতে সালেমের রাজা, পরে একজন ক্রিস্টাল ব্যবসায়ী, পরে একজন ইংরেজ এবং শেষে আলকেমিস্টের সাথে সাক্ষাৎ হয়। এবং এই প্রত্যেকের চরিত্র অবস্থানের দিক দিয়ে একেবারে ভিন্ন হলেও প্রত্যেকের ভূমিকাতে কোনরকম তফাৎ করা কঠিন। কিছু একটা ঘটছে, শুরুর দিকে হয়ত সান্তিয়াগো ভাবছে the old king had said, তারপর ক্রিস্টাল ব্যবসায়ীর সাথে দেখা হওয়ার পর হয়ে যাচ্ছে the crystal merchant had said- যেন নাম আর পোশাক বদলাচ্ছে শুধু।
তবে তাও একটা পর্যায়ে ছিলো তখন পর্যন্ত। শেষের দিকে সান্তিয়াগো নিজের হৃদয় থেকে শুরু করে একটা পর্যায়ে গিয়ে তো আকাশ-বাতাস সবকিছুর সাথে কথা বলা শুরু করে একরকম। এটা ফ্যান্টাসি সেটআপে শুরু করা একটা গল্পে মানানসই। কিন্তু ধর্ম ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় শুরু থেকে খুবই বাস্তবধর্মী একটা চিত্রায়ন উপস্থাপিত হলেও শেষের দিকে গিয়ে এই ব্যাপারগুলো পুরো গল্পটাকে রিডিকুলাস করে তুলেছে।
তো হ্যা, The Alchemist আমার কাছে সত্যিকারের অনুপ্রেরণামূলক কোন গল্প হবে না। বরং জীবনের বাস্তবতার সামনে একটা স্বপ্ন বা আশার মোহের স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারা-ই হয়ত The Alchemist এর সার্থকতা। The Alchemist আমি খারাপ বলবো না, বরং এভারেজ। তবে এটার যে জনপ্রিয়তা বা জীবন বদলে দেয়া বই হিসেবে পরিচিতি তার ধারেকাছেও আমার চোখে থাকবে না এটা।





বইটা পড়া হয়ে উঠেনি। দু একবার ভেবেছিলাম কেনার কথা। আমার কেন জানিনা অতি পরিচিত/পপুলার জিনিষে মন টানেনা। আপনার রিভিউ দেখে মনে হচ্ছেনা এই বই আবার পড়া হবে।
কেমন আছেন বাই দ্যা ওয়ে?
ভালো, আলহামদুলিল্লাহ। আমিও বেশ অনুভব করি জনপ্রিয় আর মানসম্মত দুটোর মধ্যে সম্পর্ক কমই, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এটা আরো সত্য। মুশকিল হলো বাজারে তো বইয়ের অভাব নেই, তো বাছাইয়ের জন্য কিছু একটা ক্রাইটেরিয়া দরকার হয়। আপনার দিক থেকে কোন বই সাজেস্ট করার মত থাকলে করতে পারেন।