সিম্ফনি এটম: গুগল ক্যামেরা গো এবং আরো দারুণ ফিচার

একসাথে দুটো নতুন স্মার্টফোন আনলো সিম্ফনি, যার মধ্যে আছে Symphony i67 আর Symphony ATOM। এর মধ্যে সিম্ফনি এটম বেশ আকর্ষণীয় একটি ডিভাইস বলে মনে হচ্ছে এবং এই লেখায় আমরা এটা নিয়ে কথা বলবো। তবে শুরুতেই জানিয়ে রাখি, আমি ফোনটি কিন্তু সরাসরি ব্যবহার করিনি, এটি ফোনটির বিভিন্ন দিক নিয়ে আমার পর্যালোচনা।

এটম সিম্ফনির নতুন একটি সিরিজ এবং সামনে এই সিরিজে আরো স্মার্টফোন আসবে বলে বেশ নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে। সিম্ফনি এটমের দাম রাখা হয়েছে ৭,২৯০ টাকা। এর আগে এই বাজেটে আমরা মূলত i সিরিজ থেকে ফোন আনতে দেখেছি। তবে এই ফোনটি i সিরিজ থেকে না এনে নতুন একটি সিরিজ হিসেবে আনা আমার অযৌক্তিক মনে হয়নি।

কেননা এর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর ক্যামেরা। বলা হচ্ছে এটি আরো দামি বিভিন্ন স্মার্টফোনকে ক্যামেরা সেকশনে হারাতে সক্ষম। তাছাড়া, এটম নামটা শুনতেও বেশ, এটা একটা ভালো মার্কেটিংও বটে, নয় কি?

এক্সটেরিয়র ও ডিসপ্লে

ডিজাইনে কিছুটা Z16 এর সাথে মিল মনে হয়েছে, যার সম্ভাব্য কারণ এখানেও থাকছে ম্যাট ফিনিশ। তবে ক্যামেরা হাউজিংয়ে কিছুটা ভিন্নতা আছে, আর Z16-এ তিনটি ক্যামেরা থাকলেও এখানে থাকছে মাত্র একটি, অবশ্য এই একটি ক্যামেরাতেই চমক আছে, যা পরে আলোচ্য। স্পিকার রেয়ারে দেয়া হয়েছে, যেটা লো বাজেট ফোনের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে।

তবে সামনের দিকে বেজেল ও চিন অনেক বেশিই মনে হয়েছে, যেটা সুন্দর দেখাচ্ছে না। ডিসপ্লে সেকশনে 6.22″ আকারের একটি IPS প্যানেল থাকছে, যেটা আমার মতে একটা সুন্দর সাইজ অনেকের জন্যই, ডিসপ্লে রেজ্যুলেশন হলো HD+ (1520*720), অর্থাৎ 19:9 অ্যাসপেক্ট রেশিও, 270 PPI। প্রস্থে এটা 76.1mm, যেটা কিন্তু 20:9 অ্যাসপেক্ট রেশিওর Z16 (76.3mm) এর প্রায় সমান। তবে অবশ্যই উচ্চতায় কম, 157.9।

সিম্ফনি এটমের থিকনেস এর একটি আকর্ষণীয় দিক। লো বাজেট ফোনগুলোতে থিকনেস তুলনামূলক বেশি হয়ে থাকে, সেখানে 4000 mAh ব্যাটারী দিয়ে 8.3mm থিকনেস বেশ প্রশংসনীয়। একইসাথে এটি ওজনেও বেশি ভারি নয়, 180g। তিনটি কালারে এই স্মার্টফোনটি আনা হয়েছে, Midnight Blue, Denim Blue & Pine Green। আমার কাছে প্রতিটিই সুন্দর লেগেছে।

সব মিলিয়ে এই সেকশনে আমার অল্প কিছু ব্যাপার ভালো না লাগলেও এই দামের একটি ডিভাইস হিসেবে ম্যাট ফিনিশ, থিকনেস, ওজন সব মিলিয়ে এক্সটেরিয়র সেকশনে ফোনটিকে খারাপ বলার সুযোগ একদমই নেই। বরং এই বাজেটে এরকম এক্সটেরিয়রের ফোন পাওয়া যায় না বললেই চলে।

হার্ডওয়্যার

এখানে দেয়া হয়েছে MediaTek Helio A20 এসওসি, যা একটি এন্ট্রি লেভেল কোয়াড কোর চিপসেট। এর কোর চারটি ARM Cortex A53 সিরিজের, যাদের ক্লকস্পিড 1.8GHz এবং জিপিইউ PowerVR GE8300@550MHz। এটি অবশ্যই একটি লো পাওয়ার চিপসেট এবং এর সাথে 2GB LPDDR4 র‌্যাম মিলে খুব বেশি চাপ নেয়ার জন্য এই ফোনটি আসলে তৈরি হয়নি।

এরকম বা আরো কম বাজেটে সিম্ফনি কিছু ডিভাইসে Unisoc SC9863A চিপসেটটি ব্যবহার করেছে, যেটা আসলে পারফর্মেন্স সেকশনে খানিকটা বেটার, তবে SC9863A 28nm হওয়ায় সেখানে হিটিং ও ব্যাটারী ড্রেইনিং রিলেটেড ইস্যু থাকে, যা 12nm আর্কিটেকচারে তৈরি A20-তে নেই। তাই Helio A20 ওভারঅল এই বাজেটে ব্যালেন্সড একটি চিপসেট।

ডে টু ডে ব্যবহারের জন্য A20 নিয়ে আশা করা যায় তেমন কোন সমস্যায় পড়তে হবে না, তবে লাইটওয়েট অ্যাপগুলো ব্যবহার করা উচিৎ হবে। আর এই স্মার্টফোনে কিন্তু 32GB ইন্টার্নাল স্টোরেজ দেয়া হয়েছে, যেখানে এর আগে এই দামে সিম্ফনিকে 16GB ইন্টার্নাল স্টোরেজ দিতে দেখা যেত। সবমিলিয়ে হার্ডওয়্যার সেকশনে সিম্ফনি এটম এই দামে যা দিচ্ছে, তা ঠিকই আছে বলব।

গীকবেঞ্চে এটি স্কোর করেছে সিঙ্গেল কোর ও মাল্টিকোরে যথাক্রমে ১১০ ও ৩৬৬। গীকবেঞ্চ স্কোর নিয়ে ধারণা থাকলে নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন, এরকম হার্ডওয়্যারে স্কোর কম হবে, তাই বলে এত কম কেন? আসলে এখানে সিম্ফনি অ্যান্ড্রয়েডের ৩২ বিট ভার্সন ব্যবহার করেছে, আর ৩২ বিট ভার্সনে গীকবেঞ্চের আলাদা স্কোরিং অ্যালগরিদম আছে, তাই এই অবস্থা। আনতুতু বেঞ্চমার্ক স্কোরে কিছুটা ভালো ধারণা পেতে পারেন, ডিভাইসটি ৭০ হাজারের কিছু বেশি স্কোর করেছে এখানে।

ক্যামেরা

এখনকার ডিভাইসগুলোতে ৩টি, ৪টি বা ৫টি পর্যন্ত রেয়ার ক্যামেরার দেখা দুর্লভ নয়। এমনকি ৫ হাজারেও অন্তত দুটো ক্যামেরা না দিলে যেন চলে না। সেখানে সিম্ফনি এটম দিচ্ছে শুধুমাত্র এবং কেবলমাত্র একটি প্রাইমারী ও একটি সেলফি ক্যামেরা, কারণ সত্যি বলতে দিনশেষে বেশি সংখ্যক ক্যামেরার চেয়ে একটি ভালো ক্যামেরা আপনাকে ভালো আউটপুট দিতে পারে।

সিম্ফনি এটমের প্রাইমারী ক্যামেরটি 13MP এবং এখানে Sony সেন্সর ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এই ক্যামেরাকে অসাধারণ করে তুলেছে যে ব্যাপারটি, তা হলো এখানে ইন্টিগ্রেটেড থাকছে Google Camera Go। অন্য ফোনেও আপনি হয়ত এটা ইন্সটল করতে পারবেন, কিন্তু সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ফিচারে লিমিটেশন থাকতে পারে, পূর্ণ মজা পাওয়া যাবে না।

সিম্ফনি এটমে গুগল ক্যামেরা গো বিশেষভাবে ইন্টিগ্রেটেড, HDR, Night Mode, Portrait, Translate সহ ফিচারগুলো এখানে থাকছে। এবং সফটওয়্যার কিন্তু ক্যামেরার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাই অসাধারণ ছবি তোলা সম্ভব এই ফোন দিয়ে, যা হয়ত ১০-১২ হাজার টাকার বিভিন্ন ফোনকে হারিয়ে দিতে প্রকৃতপক্ষেই সক্ষম হবে।

এন্ট্রি লেভেলের ডিভাইসে যে সমস্যাটা সবচেয়ে বেশি হয়, দিনের বেলা ভালো ছবি হলেও আলো কমলে ছবি আর সুবিধের থাকে না। তবে f/1.8 অ্যাপার্চার, আর গুগলের নাইট মোড মিলে এই ফোনে কিন্তু রাতেও আপনি তুলনামূলক বেশ ভালো ছবি আশা করতে পারেন।

5MP সেলফি ক্যামেরার অ্যাপার্চার f/2.2। তো, সেলফিতে হয়ত রেয়ার ক্যামেরার মত অতটা ভালো করতে পারবে না, তবে সফটওয়্যারের কারণে অন্য কিছু 5MP ক্যামেরা থেকে বেটার রেজাল্ট পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়।

ব্যাটারী

এখানে 4000 mAh এর ব্যাটারী থাকছে, যা বাজেটের মধ্যে বেশ বড় একটি ব্যাটারী। আর যেহেতু 12nm আর্কিটেকচারের লো পাওয়ার চিপসেট, HD+ ডিসপ্লে, ব্যাকআপ বেশ সহজেই দুদিন চলে যাবে বলে আশা রাখতে পারেন। চার্জিংয়ের জন্য থাকছে 5V 1.5A চার্জিং সুবিধা, যেটা কিছুটা ধীর, ৩ ঘন্টার বেশি সময় লাগতে পারে পুরো চার্জ হতে।

সেন্সর ও সিকিউরিটি

সিম্ফনি তাদের দামি ফোনগুলোতেও ম্যাগনেটোমিটার (কম্পাস) বা জাইরোস্কোপের মত সেন্সরগুলো দেয় না। সেখানে ৭ হাজার বাজেটের একটি ফোনে ওগুলো আশাও করি না, আর এই বাজেটে আসলে কোন ব্র্যান্ড থেকেই এই সেন্সরগুলো পাওয়া যায় না। বাদবাকি প্রয়োজনীয় সেন্সরগুলো থাকছে, যেমন, লাইট, প্রক্সিমিটি ও গ্রাভিটি সেন্সর।

ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরও থাকছে, সিম্ফনি এরকম বাজেট এমনকি আরো অনেক কম বাজেটেও ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর দিয়ে থাকে, যেটা খুব ভালো ব্যাপার। একইসাথে থাকছে সেলফি ক্যামেরাভিত্তিক ফেস আনলক সুবিধা।

সফটওয়্যার

এর আগে এরকম বাজেটে আমরা সিম্ফনিকে অ্যান্ড্রয়েডের পূর্ণ ভার্সন ব্যবহার করতে দেখেছি। তবে এবার তারা অ্যান্ড্রয়েড ১০-এর গো ভার্সন ব্যবহার করেছে। ফলে এখানে অ্যান্ড্রয়েডের একটি লাইটার এক্সপ্রেরিয়েন্স পাওয়া যাবে এবং লো পাওয়ারফুল হার্ডওয়্যারে একটি ভালো পারফর্মেন্স দিতে পারবে। আর আমরা তো জানিই, সিম্ফনি মূলত কাস্টমাইজড ইউআই ব্যবহার করে না। এখানে বিজ্ঞাপন, ব্লটওয়্যারের ব্যাপারও নেই বলা যায়, ফলে একটি ক্লিন এক্সপেরিয়েন্স দিতে পারে।

অন্যান্য

ফোনটিতে ফোরজি সমর্থন অবশ্যই থাকছে, থাকছে ওটিজি সুবিধা। থাকছে না কোন নোটিফিকেশন লাইট, সেলফি ক্যামেরাতে ফ্ল্যাশও থাকছে না। চার্জিং পোর্ট মাইক্রোইউএসবি টাইপ বি।

এক নজরে

ভালো লাগা

ম্যাট ফিনিশ
থিকনেস ও ওজন
স্টোরেজ
ব্যাটারী
ক্যামেরা
ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর

ঠিক আছে

চিপসেট
র‌্যাম

ভালো না লাগা

রেয়ার মাউন্টেড স্পিকার
চিন ও বেজেল

মতামত

সিম্ফনি এটম আমার ভালো লেগেছে। অল্প বাজেটের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ক্যামেরা এক্সপেরিয়েন্স পেতে চাইলে স্মার্টফোনটি বিশেষভাবে সাজেস্ট করা যায়। এর ম্যাট ফিনিশ এর সৌন্দর্য্যকে বাড়িয়ে দেয়। 6.1″ আর 6.5″ ডিসপ্লের ভিড়ে 6.22″ দেখেও বেশ ভালো লাগলো। চিপসেটসহ কিছু দিক অনেকের হয়ত আপত্তি থাকতে পারে, তবে এই বাজেটে আমার কাছে মনে হয়নি তা নিয়ে অভিযোগ করা ঠিক হবে।

আপনি যদি আরো ভালো পারফর্মেন্স চান, আপনাকে আসলে বাজেট কিছুটা বাড়াতে হবে। এর বাইরে ডিসপ্লে, ক্যামেরা, ব্যাটারী ব্যাকআপ সব মিলিয়ে সিম্ফনি এটম ভালো একটি এক্সপেরিয়েন্স দিতে পারবে বলেই আমার ধারণা। তাই সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য খুব অল্প দামের মধ্যে Symphony ATOM খুব ভালো একটি প্যাকেজ হতে পারে।

আরো দেখুন: অফিসিয়াল ওয়েবপেজ

Loading spinner

Leave a Reply

Your email address will not be published.

You may use these <abbr title="HyperText Markup Language">html</abbr> tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

*