এয়ার চার্জিং: বড় পরিবর্তনের সূচনা আনতে পারে যে প্রযুক্তি

প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার শুরুতে তার, তার এবং তার হয়ে উঠেছে আমাদের জীবনের প্রায় অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এরপর আমরা তারবিহীন প্রযুক্তির দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেছি, ধীরে ধীরে বিভিন্ন তারযুক্ত প্রযুক্তিকে প্রতিস্থাপিত করে স্থান করে নিচ্ছে বিকল্প তারহীন প্রযুক্তিগুলো। আর এর ধারাবাহিকতায় নতুন সংযোজন তারবিহীন চার্জের প্রযুক্তি, এয়ার চার্জিং।

বর্তমানে যে ওয়ারলেস চার্জিং প্রযুক্তি প্রচলিত, তা আসলে কিন্তু ততটাও ওয়ারলেস নয়। কেননা এখানে স্মার্টফোনটি একটি ডকের ওপর রাখতে হয়, যে ডকটি আবার তারের সাহায্যে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রযুক্তি ততটা কনভিনিয়েন্ট নয়, আর স্বাভাবিকভাবেই প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার সাথে যে সত্যিকারের ওয়ারলেস চার্জিংয়ের আগমন ঘটবে, তা অনুমেয় ছিলো এবং এখন এয়ার চার্জিং হিসেবে তার সূচনা হচ্ছে।

ইতোমধ্যেই আমরা দুটো কোম্পানির পক্ষ থেকে এই প্রযুক্তির ঘোষণা পেয়েছি, শাওমি ও মটোরোলা। এবং ঠিক এই সময়ে প্রযুক্তির জগতে এটা একটা হট টপিক। কেননা এই প্রযুক্তিই হতে পারে পরবর্তী প্রজন্মের চার্জিংয়ের স্ট্যান্ডার্ড। বর্তমানে যেমন আমাদের বিভিন্ন ডিভাইস আলাদা আলাদাভাবে চার্জ দিতে হয়, তখন হয়ত আর তেমনটা হবে না, বাসা বা প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীয়ভাবে একটা এয়ার চার্জার থাকবে, যা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিভাইসগুলো প্রয়োজনমত চার্জ হয়ে যাবে।

আর এই ভাবনাটা অস্বাভাবিকও নয়, কেননা আজ থেকে ১০-১২ বছর আগে আমরা পিসিতে নেট ব্যবহারের জন্য কোন একটি মডেম কিংবা সরাসরি ব্রডব্যান্ড ব্যবহার করতাম, এখন বাসা বা অফিসগুলোতে এর জায়গায় ওয়াইফাই স্থান করে নিচ্ছে, ঘরের যেকোন জায়গা থেকে, যেকোন সমর্থিত ডিভাইসে একটি ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমেই আমরা সংযুক্ত হতে পারছি।

অবশ্য এখনও এই প্রযুক্তি এতদূর অগ্রসর হয়নি, আর প্রযুক্তির অগ্রগতি ধাপে ধাপেই হয়ে থাকে। মটোরোলা তাদের প্রযুক্তির একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেটি একসাথে দুটো ডিভাইস চার্জ করতে সক্ষম, তবে তারা খুব বিস্তারিত জানায়নি। তবে ইতোমধ্যেই শাওমি তাদের নতুন এই প্রযুক্তি নিয়ে অফিসিয়ালি বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে।

তবে টেকক্রাঞ্চকে দেয়া সাক্ষাতকারে শাওমির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ২০২১ সালে তারা এই প্রযুক্তি মার্কেটে আনবে না, যেটা বেশ যৌক্তিক একটি সিদ্ধান্ত বলে মনে করছি, কেননা নতুন এই প্রযুক্তি সকলের কাছে পৌছে দেয়ার আগে সম্ভবত আরো রিসার্চ ও ডেভেলোপমেন্ট প্রয়োজন।

শাওমির প্রযুক্তির মূল ব্যাপার হলো অবস্থান শনাক্তকরণ ও শক্তির সঞ্চালন। শাওমির ডেভেলোপকৃত বিচ্ছিন্ন ৫ স্তরের চার্জিং পাইল স্মার্টফোনের অবস্থান সঠিকভাবে নির্ধারণ করে এবং এরপর ১৪৪টি এন্টেনাযুক্ত একটি দশা নিয়ন্ত্রক অ্যারে (phase control array)-র মাধ্যমে মিলিমিটার তরঙ্গ সরাসরি রশ্মিগঠন বা বীমফর্মিংয়ের মাধ্যমে ডিভাইসে প্রেরণ করে।

এনিমেশন ক্রেডিট: শাওমি

পাশাপাশি স্মার্টফোনের জন্য শাওমি একটি ক্ষুদ্রায়িত অ্যান্টেনা অ্যারে তৈরি করেছে, যেখানে সঙ্কেত এন্টেনা (beacon antenna) ও ১৪টি অ্যান্টেনার সমন্বয়ে প্রাপক অ্যান্টেনা অ্যারে (receiving antena array) থাকছে। সঙ্কেত এন্টেনা অল্প পাওয়ার কনজিউম করে স্মার্টফোনটির অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করে, অন্যদিকে প্রাপক অ্যান্টেনা অ্যারে চার্জিং পাইল থেকে আগত মিলিমিটার তরঙ্গকে একটি রেকটিফায়ার সার্কিটের মাধ্যমে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর করে নেয়।

এভাবে বর্তমানে ডিভাইসটির চারিদিকে কয়েক মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় সর্বোচ্চ একটি স্মার্টফোনেকে চার্জ করতে পারে এই প্রযুক্তি। এখন পর্যন্ত এতে ৫ ওয়াট গতিতে চার্জিং সম্ভব। অবশ্যই মনে রাখতে হবে এটা কেবল সূচনা, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সামনে আরো বিস্তৃত এলাকায় একত্রে একাধিক ডিভাইস আরো উচ্চ গতিতে চার্জ করার মত প্রযুক্তি আমরা দেখার আশা রাখতে পারি।

তবে এরকম একটি প্রযুক্তির সাথে খুব স্বাভাবিকভাবেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আলোচনা চলে আসে। এর তরঙ্গ ঠিক কতটা ক্ষতিকর প্রভাব রাখতে পারে মানবস্বাস্থ্য বা প্রকৃতিতে, তা এখনো জানা যায়নি। তবে সত্যি বলতে বর্তমানে আমরা বিভিন্ন ধরণের মোবাইল নেটওয়ার্ক, ওয়ারলেস সিগনাল প্রভৃতির মাঝেই বাস করছি আর এভাবেই আমরা অভ্যস্থ হয়ে উঠেছি, তাই এটা নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তাও সম্ভবত ফলপ্রসু নয়।

সোর্স: Android AuthorityMi Blog

Leave a Reply