realme C17: রিয়েলমির সাথে যায় না (নিয়নবাতি স্কোর: ৫৪/১০০)

বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মত একটি স্মার্টফোনের গ্লোবাল লঞ্চ সবার আগে হলো, তাই realme C17 নিয়ে আলোচনা, সাথে সমালোচনাও বেশ হচ্ছে। সমালোচনার অবশ্য কারণও আছে। প্রতিটি ব্র্যান্ডের থেকে এক্সপেক্টেশনের কিছুটা পার্থক্য থাকে, রিয়েলমির কাছে যেরকম এক্সপেক্টেশন থাকে, এই ফোনটি মোটেও সেকরম নয়।

সবার আগে এর দাম জানিয়ে রাখি, ১৬০০০ টাকা থেকে ১০ টাকা কমদামে এসেছে এই ডিভাইসটি। এর মূল আকর্ষণ হলো ডিজাইন, হায়ার রিফ্রেশ রেট ডিসপ্লে ও র‍্যাম-রম। এর চিপসেট Qualcomm Snapdragon 460, যা পারফর্মেন্স সেন্ট্রিক একটি ব্র্যান্ড থেকে এই বাজেটে একদমই বেমানান। রিয়েলমিকে এর আগে যেরকম অল্প বাজেটে খুব ভালো চিপসেট দিতে আমরা দেখেছি, এবার তা হচ্ছে না।

সত্যি বলতে এটা Oppo বা vivo ব্র্যান্ডিংয়ের সাথে বেশি মানানসই, আর আসলেই এটা Oppo A53 এর প্রায় অনুরূপ, Vivo Y20-ও বেশ কাছাকাছি। রিউমার শোনা যাচ্ছে একই চিপসেট দিয়ে OnePlus Clover-ও আসতে পারে। মানে BBK Electronics, এই ব্র্যান্ড চারটি যে কোম্পানির মালিকানাধীন, তাদের ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে এখন বলতে গেলে কোন তফাৎ-ই রাখছে না।

এরপর C সিরিজটিও ব্যাপক কনফিউজিং। C1, C2, C3, C11, C12, C15, C17 নামগুলোর মধ্যে যেমন ধারাবাহিকতার চিহ্ন নেই, তেমনি দাম আর কনফিগারেশন দেখেও একই সিরিজভুক্ত করার কারণ বোঝা কঠিন। ৯০০০ থেকে ১৬০০০ টাকা, ২ জিবি থেকে ৬ জিবি র‍্যাম, Helio G35 থেকে Helio G70 বা Snapdragon 460 চিপসেটের ফোন, ডিজাইন ল্যাঙ্গুয়েজও বিভিন্নরকম এরকম সব ডিভাইস একই সিরিজে কেন তা একদমই বোধগম্য হয়নি।

কিছু বাড়তি কথা হলো, এখন ফোনের কথায় আসি। তার আগে আরো একটা কথা বলে রাখি, আমি ডিভাইসটি ব্যবহার করিনি, বা দেখিওনি, আমরা মূলত খাতা-কলমের হিসেব নিয়ে কথা বলছি, বাস্তব অভিজ্ঞতা কিছু ভিন্ন হতে পারে।

realme C17

ফোনটির ডিজাইন বেশ সুন্দর, এটা বলতেই হবে। তবে এখানে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরটি রেয়ার মাউন্টেড না হয়ে সাইড মাউন্টেড হলে সম্ভবত আরেকটু সুন্দর দেখাতো। আয়তাকার ক্যামেরা বাম্পে থাকছে ৪টি ক্যামেরা লেন্স ও ফ্ল্যাশ। ডিজাইন এই ফোনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি।

ডিসপ্লে সেকশনে 90Hz রিফ্রেশ রেট অবশ্যই এত অল্প দামের মধ্যে আকর্ষণীয় ব্যাপার, কিন্তু যখন এই ডিসপ্লেটি HD+ (1600*720) IPS প্যানেল, তখন আসলে 90Hz এর মর্যাদা বেশ ক্ষুণ্ন হয়। পাঞ্চহোল কিংবা 90Hz যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, তা দিয়ে রেজ্যুলেশনের ঘাটতি কিন্তু পূরণ হবে না। FHD+ ডিসপ্লে এই দামে অবশ্যই আশা থাকে।

এছাড়া এর চিপসেট 90Hz এর স্মূথনেস ডেলিভার করতে কতটা সক্ষম হয় সেটিও দেখার বিষয়। কেননা, এর চিপসেট 90Hz এর জন্য যথেষ্ট ক্যাপাবল নয়। একদম সাধারণ অবস্থায় কিছুটা বাড়তি স্মুথনেস পাওয়া যেতে পারে, তবে প্রসেসরের ওপর কিছুটা প্রেসার পড়লে এটা বাড়তি রিফ্রেশ রেটের ‘বোঝা’ কতটা সামলাতে পারে তা একটা বড় প্রশ্ন।

নচের পরিবর্তে রয়েছে পাঞ্চহোল, যেটি অনেকের জন্যই ভালো একটি ব্যাপার। রিয়েলমি বলছে স্ক্রিন টু বডি রেশিও 90%। এখানে গরিলা গ্লাসের প্রটেকশন থাকছে, তবে ভার্সন উল্লেখ নেই, যা Gorilla Glass 3 নির্দেশ করে।

ক্যামেরা সেকশনটি ফোনের অন্যতম হতাশাজনক দিক। এখানে কোয়াড ক্যামেরা সেটআপ থাকলেও প্রাইমারী ক্যামেরাটি 13MP f/2.2। এই ক্যামেরা থেকে এক্সপেক্টেশন সীমিত রাখাই ভালো। রাতে ছবি তোলার জন্য Super Nightscape Mode থাকছে, তবে স্লো-মোশন রেকর্ডিং সুবিধা সম্ভবত থাকছে না।

অন্য ক্যামেরা তিনটির মধ্যে একটি আল্ট্রাওয়াইড লেন্স আছে, 8MP f/2.2, যেটা ভালো ব্যাপার। তবে বাকি দুটো ক্যামেরা 2MP f/2.4 এর ম্যাক্রো লেন্স ও B&W লেন্স। অনেকে এই ক্যামেরাগুলোকে ইউজলেস বলে থাকেন, তবে আসলে না, ক্যামেরার সংখ্যা বাড়ানোর জন্য এদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। অন্যদিকে সেলফি ক্যামেরাটি 8MP f/2.0।

এবার আসা যাক এই ফোনের সবচেয়ে বেশি আলোচিত-সমালোচিত অংশ এর চিপসেট নিয়ে। এখানে থাকছে Qualcomm Snapdragon 460। 400 সিরিজ মূলত স্ন্যাপড্রাগনের এন্ট্রি লেভেলের চিপসেট সিরিজ। তবে SD460 এই সিরিজের অন্যান্য চিপসেটের তুলনায় বেশ ভালো, তবে realme 5i যেখানে SD665 দিয়েছে ১৩০০০ টাকায়, ১১০০০ টাকায় C3 দিয়েছে G70, তখন ১৬০০০ টাকায় SD460 একদমই আনএক্সপেক্টেড।

এখানে চারটি হাই-পারফর্মেন্স Cortex-A73@1.8GHz (Kryo 240 Gold) কোর থাকছে, A70 সিরিজের কোন সম্ভবত 400 সিরিজে এটাই প্রথমবার। ফলে গীকবেঞ্চে সিঙ্গেল কোরে SD450 থেকে এটা প্রায় 70% বেটার পারফর্মার। অন্য চারটি কোর হলো Cortex-A53@1.6GHz (Kyro 240 Silver)। এখানে GPU থাকছে Adreno 610। এর ট্রানজিস্টর সাইজ 11nm।

SD665-এও একই ধরণের সিপিইউ কোর, জিপিইউ ব্যবহার হয়েছিলো, তবে এখানে ক্লকস্পিড কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, এবং এর ফলে পারফর্মেন্সেও এটা পিছিয়ে, বিশেষ করে সিঙ্গেল কোরে। গীকবেঞ্চে সিঙ্গেল কোরে ২৫০ ও মাল্টিকোরে ১২০০ এর আশেপাশে এর স্কোর, যেটা এই দামের ফোন হিসেবে অনেক কম। realme 5i এর স্কোর ছিলো ৩০০ ও ১৩০০ এর আশেপাশে।

রিয়েলমি ফোন বলতে আমরা বুঝি পারফর্মেন্স সেন্ট্রিক। এই ফোনেও ক্যামেরা, ডিউরেবিলিটি, মাল্টিমিডিয়া এরকম কোন দিকে ফোকাস দেখা যাচ্ছে না। আবার পৃথিবীর প্রথম (যদিও Oppo A53 আর vivo Y20 আগেই এসেছে) SD460 বলে প্রচার করে পারফর্মেন্স সেন্ট্রিক বোঝানো হচ্ছে। তো, এটা যদি অন্য কোন দিকে ফোকাসড থাকতো, তাহলে চিপসেট ওকে বলা যেত। কিন্তু একটা পারফর্মেন্সড ফোকাসড ফোনে ১৬০০০ টাকায় এই জিনিস?

তবে মেমোরি আর স্টোরেজের বেলায় কোন কার্পন্য করেনি রিয়েলমি। 6GB LPDDR4X সিরিজের র‍্যাম মাল্টিটাস্কিংয়ের জন্য এটি ভালো চয়েস হতে পারে (অবশ্যই চিপসেট লিমিটেশন মাথায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ)। সাথে 128GB ইনবিল্ট স্টোরেজ আছে, যা প্রায় সবার জন্যই পর্যাপ্ত হবে আশা করা যায়। এরপরও না চললে ডেডিকেটেড এসডি কার্ড স্লটও থাকছে। এই ফোনের সবচেয়ে বড় সেলিং পয়েন্ট সম্ভবত এটিই।

5000mAh এর Massive (রিয়েলমির ভাষায়) ব্যাটারী থাকছে এখানে, তবে এখন 5000mAh মোটেও ম্যাসিভ কিছু নয়, একদমই সাধারণ ব্যাপার। সাথে 18W ফাস্ট চার্জিং সমর্থিত। চার্জিংয়ের জন্য থাকছে Type C পোর্ট, এছাড়া 3.5mm ইয়ারফোন জ্যাকও আছে।

সেন্সর সেকশনে লাইট, প্রক্সিমিটি, একসেলারেশন সেন্সর থাকছে, আর থাকছে ম্যাগনেটিক ইনডাকশন সেন্সর।

মতামত

এটাকে দুভাবে মূল্যায়ন করা যায়, প্রথমে যদি ধরে নিই এটা realme ছাড়া অন্য কোন ব্র্যান্ডের ডিভাইস, তাহলে বলতে হবে ফোনটা বেশ সুন্দর, 90Hz রিফ্রেশ রেট, পাঞ্চহোল, 6/128 সব মিলিয়ে আকর্ষণীয়, তবে রেজ্যুলেশন FHD+ আর ক্যামেরা সেটআপ আরেকটু উন্নত হলে জোস একটা ডিল হতে পারতো।

আর যদি রিয়েলমি হিসেবে মূল্যায়ন করি, তাহলে আরেকটু অন্যভাবে বলতে হবে। তারা ডিজাইন, 90Hz, ৪টা ক্যামেরা, বেশি র‍্যাম-রম দেখাচ্ছে, অথচ চিপসেট আগের থেকে ডাউনগ্রেড, এটা একদমই রিয়েলমির সাথে যায় না। সেই সাথে 6i এর মত আবার HD+ ডিসপ্লে ধরিয়ে দিয়েছে, ক্যামেরার অবস্থা আরো শোচনীয়। এইটা কোন কথা?

নিয়নবাতি স্কোর

এই পর্যায়ে এসে নিয়নবাতি স্কেলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। নিয়নবাতি স্কেল কোন স্মার্টফোন কতটা ভ্যালু ফর মানি তা নির্ণয়ের জন্য বিশেষায়িত। এখানে ৮টি ক্যাটাগরীতে স্মার্টফোনকে স্কোর দেওয়া হবে। ক্যাটাগরীভেদে নাম্বারের ভিন্নতা আছে, যেমন চিপসেটের জন্য ২০, ডিসপ্লের জন্য ১০।

কোন ক্যাটাগরীতে 50% নাম্বার পাওয়া অর্থ হলো এই দাম অনুযায়ী ওকে। মোট স্কোর 70+ অর্থ গ্রেট ভ্যালু ফর মানি, 60 এর মত হলে ভালো একটি ডিল, 50 হলে এভারেজ, এর কম হলে ওভারপ্রাইসড।

নিয়নবাতি স্কেলে realme C17 এর স্কোর:

  • ডিজাইন: ৫/৮
  • বিল্ড: ৪/১০
  • ডিসপ্লে: ৭/১২
  • ক্যামেরা: ৬/১৫
  • ব্যাটারী ও চার্জিং: ৬/১০
  • চিপসেট: ১০/২০
  • মেমোরি-স্টোরেজ: ১২/১৫
  • সেন্সর ও অন্যান্য: ৪/১০

মোট স্কোর: ৫৪/১০০

নিয়নবাতি স্কেল অনুযায়ী এই ডিভাইসটি এভারেজ বলা যায়। এই দামে ঠিক আছে, তবে ইমপ্রেসিভ কিছু নয়। তবে ব্যাপারটা হচ্ছে, এই স্কেলের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এই যেমন, 90Hz, 6GB র‌্যামের জন্য পয়েন্ট বেড়েছে, যেটা আসলে এই ফোনে অপ্রয়োজনীয়। আমরা চেষ্টা করছি এই স্কেলকে ভবিষ্যতে আরো একুরেট করার।

তথ্য ও ছবি সোর্স

Leave a Reply