নবম শ্রেণি – বিজ্ঞান – পড়াশোনা নিয়ে কিছু খোলামেলা কথা

This entry is part 1 of 5 in the series নবম শ্রেণি - বিজ্ঞান

নিয়নবাতিতে এর আগে এসএসসি পদার্থবিজ্ঞান সিরিজের অধীনে কয়েকটি পূর্বের শিক্ষাক্রমের নবম-দশম শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞান বইয়ের প্রথম পাঁচটি অধ্যায় এবং ষষ্ঠ অধ্যায় আংশিকভাবে কভার করা হয়েছে। এরপর নিজের পড়াশোনা ও অন্যান্য ব্যস্ততা এবং অলসতার সমন্বয়ে বাকি অধ্যায়গুলোতে আর যাওয়া হয়নি। তো এর মধ্যে অনেক কিছুই বদলেছে, এবছর নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষাক্রম সম্পূর্ণ বদলে ফেলা হয়েছে। নতুন শিক্ষাক্রমের সাথে সামঞ্জস্য করে নতুন এই সিরিজটি সাজানো হবে ইন শা আল্লাহ। তবে শুরু করার আগে বর্তমান শিক্ষাক্রম এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক পর্যায়ে একাডেমিক পড়াশোনা নিয়ে আমার বেশ কিছু কথা বলার আছে।

সত্যি বলতে কী, পূর্বের শিক্ষাক্রম কিংবা তার আগে আমাদের সময়ে পাঠ্যবই যে খুব ভালো ছিলো, এরকম না। তবে এখন যা করা হয়েছে, এটা আসলে কল্পনাতীত। আমি দৃঢ়ভাবেই মনে করি, বর্তমান পদ্ধতিতে একাডেমিক পাঠদানের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য হলো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মতের দিকে দীক্ষিত করা। পাঠ্যবইয়ের শেষেই অবশ্য একটা কথা আছে, “শিক্ষা নিয়ে গড়ব দেশ, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ”। তো এত পরিষ্কার একটা কথার পর বোধহয় প্রচলিত একাডেমিক শিক্ষা যে মৌলিকভাবে একটা মতদীক্ষাদান প্রক্রিয়া, এটা আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।

এই মতদীক্ষাদানের যে ব্যাপারটা, এটা বাংলাদেশের জন্য শুধু নয়, অনেকাংশে বৈশ্বিকভাবে প্রযোজ্য। একটা মতকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আদর্শ উপায় হলো পরবর্তী প্রজন্মকে শুরু থেকেই তাতে দীক্ষিত করা। বাংলাদেশে বর্তমানে পাঠ্যবইয়ে, বিশেষত সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে পশ্চিমা জেন্ডার আইডিওলোজি অর্থাৎ সামাজিক লিঙ্গের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিবাদে অনেকেই সরব হয়েছেন, এরপরও এতে পরিবর্তন আসেনি। পশ্চিমা কিছু দেশে এই ব্যাপারটি আরো ভয়াবহ রূপে আছে। শিশুকাল থেকেই সমকামিতা, জেন্ডার আইডিওলোজি প্রভৃতির দিকে দীক্ষিত করা হচ্ছে। এর বাইরে বিতর্কিত ইতিহাসের পাঠ, কিংবা সাংস্কৃতিক পক্ষপাতিত্বের মত ব্যাপারগুলো নতুন কিছু নয়।

এমনিতেও আমি মৌলিকভাবে বিশ্বাস করি যে সবার একাডেমিক পদ্ধতিতে উচ্চশিক্ষার দিকে যাওয়াটাতে সমস্যা আছে। এতে ভারসাম্য নষ্ট হয়। যথেষ্ট যোগ্যতা থাকলেও একই পথের পথিক বহুজনে থাকায় প্রতিযোগিতায় অনেকেই পেরে ওঠে না। যেকারণে জীবনের ২০-২৫ বছরের অধিকাংশ পড়াশোনায় ব্যয় করার পরেও আলাদাভাবে স্কিল অর্জন, পরিচিতি, এবং ‘চা-পানি’র মত বিষয়গুলো চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কিন্তু এই সব কথা বলার পরও আমি নিজেও মূলধারার শিক্ষার মধ্যেই আছি। কেন? কারণ প্রচলিত ধারার বাইরে যাওয়াও সহজ না। স্রোতের বিপরীতে চলার মত ব্যাপারটা। এজন্য যে দৃঢ়তা প্রয়োজন তা আমার মধ্যে নেই। এবং আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি এটা বলবো যে, যদি যথেষ্ট সতর্ক ও সচেতন থাকা হয়, চিন্তার দুয়ার বদ্ধ না থাকে, তাহলে একাডেমিক পাঠ্যক্রম থেকে ভালো কিছু নেয়া খুবই সম্ভব। তবে যত সময় যাচ্ছে, চ্যালেঞ্জও তত বাড়ছে। তাই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সতর্ক হতে হবে অনেক বেশি।

সেই সাথে একটা পরিবর্তন খুবই দরকার। যেন সবাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দৌঁড়ে না থেকে নিজ আগ্রহ ও পারদর্শিতা অনুযায়ী আগায়। যাদের সত্যিকারভাবে গবেষণা, ডাক্তারি কিংবা এমনকিছুর লক্ষ্য আছে যার জন্য একাডেমিক পড়াশোনা দরকার তারাই যেন শুধু উচ্চশিক্ষার দিকে যায়। এজন্য দরকার সামাজিকভাবে সব পেশার প্রতি নায্য সম্মান প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এবং অবশ্যই সম্মানে পেট ভরে না, প্রতিটি কাজের নায্য মূল্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া অত্যন্ত জরুরী।

তবে সেই দিন আসার আগে ঠিক এখন যারা শিক্ষার্থী আছে, কোন সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও পর্যালোচনা ছাড়া পড়াশোনায় উদাস হয়ে যাওয়া বা ছেড়ে দেয়া এটা মোটেও কোন প্রশংসাজনক কিছু হবে না। পড়াশোনাকে একমাত্র ধ্যানজ্ঞান বানিয়ে নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামলে তার শেষ পরিণতি হয়ত হতাশায় হবে। জীবনে একটা পরিকল্পনা থাকার পাশাপাশি আরো বিকল্প পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন, কারণ সবকিছু সবসময় পরিকল্পনা অনুযায়ী যাবে না। পড়ে গেলেও উঠে দাঁড়াতে জানতে হবে, একটা পরিকল্পনা ভেঙে গেলে অন্য পরিকল্পনা নিয়ে আগাতে হবে। এবং তোমাকে জানতে হবে তুমি কী করছ এবং কেন করছ।

তো নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী যারা এই লেখাটি পড়ছো, এই পর্যায়ে আমি ঠিক এই প্রশ্নটাই তোমাকে করতে চাই। তুমি কেন পড়াশোনা করছ এবং এখান থেকে তুমি কী অর্জন করতে চাও? উত্তর অনেকরকম হতে পারে। হতে পারে তুমি জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে ভালো মনে করছো। হতে পারে তোমার ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক কিংবা গবেষক হওয়ার ইচ্ছা আছে। হতে পারে তোমার পরিবার চায় বলে তুমি পড়াশোনা করছো। হতে পারে অর্থোপার্জনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পড়াশোনা করছ। হতে পারে পড়াশোনা না করলে বিয়ে করতে মুশকিল হবে আশঙ্কা করছ। কিন্তু যেটাই হোক না কেন, তুমি যখন কিছু করবে, তুমি যেন অবশ্যই সেটা না জেনে, না বুঝে না কর।

আমি চাইবো তুমি এই প্রশ্নটা নিয়ে সময় নিয়ে ভাবো এবং তোমার নিজের উত্তর প্রস্তুত কর। যদি উত্তর না পাও, তুমি পড়াশোনা ছেড়ে দেওনি কেন এভাবে চিন্তা করতে পারো। এরপর কোথাও লিখে সংরক্ষণ করে রাখো, ভালো হয় যদি ডায়েরি বা এমন কিছু হয়। উত্তরটা শুধু নিজের কাছে রাখতে পারো, আর যদি সেটা অন্যদের জানানোতে সমস্যা না থাকে, তাহলে কমেন্ট বক্সেও জানাতে করতে পারো তোমার উত্তর।

Series Navigationনবম শ্রেণি – বিজ্ঞান – নতুন বই পর্যালোচনা >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *